শনিবার, ২৫-নভেম্বর ২০১৭, ০১:২২ অপরাহ্ন

প্রিয় বাংলাদেশ, ভাতের অভাবে কিশোরীর আত্মহত্যার দায় কার?

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০১৭ ০৮:৫৬ অপরাহ্ন

আহমেদ আরিফ: ভাতের অভাবে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে শেরপুরের কিশোরী কণিকা। অত্যন্ত শান্ত ও চাপা স্বভাবের কিশোরী কণিকা আত্মহত্যার যন্ত্রণা দিয়ে আজীবনের জন্য মিটিয়েছে ক্ষুদার যন্ত্রণা। ২৭ অক্টোবর শীর্ষ নিউজের লিড নিউজটি পড়তে গিয়ে আনমনেই চোখ ভিজে গিয়েছে।
চোখ ভিজে যাবার ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বরগুনার কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের জাকিরতবক গ্রামের ১০ বছর বয়সী ছোট্ট সোনাবরুর ভাতের অভাবে আত্মহত্যার হৃদয় বিদারক খবরটি আজ পর্যন্ত ভুলতে পারিনি। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে হাঁড়িতে ভাত না পেয়ে আত্মহত্যা করেছিল সোনাবরুর। রাস্তা ঘাটে মলিন মুখের ক্ষুদার্ত শিশুদের দেখলেই সোনাবরুর আত্মহত্যার ঘটনাটি প্রায় আমার মনে পড়ে। একমুঠো ভাতের জন্য কণিকা, সোনাবরুর মত আর অনেক কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার খবর পড়ার দূর্ভাগ্য আমাদের আর কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে?
প্রিয় বাংলাদেশ, ভাতের জন্য কোমলমতি কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার দায় কার? রাষ্ট্রের? ক্ষমতাসীনদের?
দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেকেই বলবেন, হ্যাঁ ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের। কারণ, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। একটি রাষ্ট্রে ক্ষুধার যন্ত্রণায় মাত্র ১০ বছর বয়সী শিশু যখন আত্মহত্যা করে তখন সে দায় কোনভাবেই ক্ষমতাসীনরা এড়াতে পারেনা। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে কি এমন করুণ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি? সহজ উত্তর, ঘটেছে।
না, সব দোষ রাষ্ট্রের না। সব দোষ আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপিরও না।আমরা যারা সচ্ছল ফ্যামিলির তারা কোনভাবেই এই দায় এড়াতে পারিনা।

আমাদের ফ্যামিলি দিয়েই একটি উদাহরণ দেই। আমার ভাবী বাচ্চাদের খাওয়ানোর সময় প্লেটে অতিরিক্ত খাবার নিত। প্রায় সময় দেখা যেত অনেক ভাত ফেলে দিচ্ছে। কারণ, বাচ্চারা যতটা খেতে পারবে তার চাইতে বেশী পরিমাণ খাবার নিতেন উনি। খাবার নষ্ট নিয়ে কিছু বললেই ভাবী ভেবে বসত, উনার বাচ্চাদের খাবারের হিংসা করছে অন্যরা!
ফ্যামিলির অন্যরা 'ঝামেলা' এড়াতে ভাবীর খাবার নষ্ট করার ব্যাপারটি তাই এড়িয়ে যেত। কিন্তু, ভাবীর খাবার নষ্ট করার অন্যায়কে আমি মেনে নিতে পারিনি। প্রথমে ভালভাবে, এরপর বকা দিয়েই ব্যাপারটির প্রতিবাদ করেছি।আমার প্রতিবাদের কারণেই হউক কিংবা ভাবীর শুভবুদ্ধির উদয়ের কারণেই হউক এখন উনি আগের মত ভাত নষ্ট করেন না।
আমাদের ফ্যামিলির মতই বাংলাদেশের বেশীর ভাগ সচ্ছল ফ্যামিলিরই প্রায় একই চিত্র। সচ্ছল ফ্যামিলিতে বেশীর ভাগ মায়েরা বাচ্চাদের খাওয়াতে গিয়ে যে পরিমাণ খাবার নষ্ট করেন তা যদি দরিদ্র ফ্যামিলির শিশুদের মুখে তুলে দেওয়া হত তাহলে কি কোমলমতি কণিকা, সোনাবরুরা আত্মতহ্যার পথ বেছে নিত? এই প্রশ্নটি কি আমরা আমাদের বিবেককে একবারও করেছি?
ডাস্টবিন থেকে তুলে শিশুরা খাচ্ছে এমন শত শত ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল। অনলাইনে সেসব ছবি দেখে আমরা হা-হুতাশ করি। ফেসবুকে আপলোড দিয়ে শেয়ার করে রাষ্ট্রের চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করি। অথচ এই আমরাই বিয়ে, আকিকা বৌ-ভাত সহ সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর দাওয়াতে গিয়ে পরিমাণের চাইতে বেশী খাবার নিয়ে পরে ফেলে দেই।
প্রিয় পাঠক, আসুন সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই। খাবার নষ্ট না করে আশপাশের দরিদ্র মানুষগুলোর মুখে তুলে দ্ইে। আমাদের একটু সদিচ্ছায় ঠেকিয়ে দিতে পারে একজন কণিকা কিংবা সোনাবরুর আত্মহত্যা।
-লেখক ও কলামিস্ট