বৃহস্পতিবার, ১৪-ডিসেম্বর ২০১৭, ০৪:১৪ অপরাহ্ন

রোহিঙ্গা প্রশ্নে সার্ক রাষ্ট্রগুলোর হীনমন্যতা

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০৩:২৫ অপরাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: গত ১৬ নভেম্বর মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন ও তাদরেকে স্বদেশ থেকে বিতাড়ন  বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে একটি প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে। ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭১টি সদস্য রাষ্ট্র সাধারণ পরিষদের বৈঠকে উপস্থিত এবং ২২ রাষ্ট্র অনুপস্থিত ছিল। ভোটাভোটিতে অংশ নেয়া ১৩৫ টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ১০ টি রাষ্ট্র। ২৬ টি রাষ্ট্র ভোট দানে বিরত থেকেছে। সার্বিক বিবেচনায় ভোটাভোটির ফলাফল কাঙ্খিত হয়েছে। কিন্তু এই ভোটাভোটিতে খুবই অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটেছে। যা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিস্মিত ও হতাশ করেছে। কারণ, আমাদের অতি নিকট প্রতিবেশী ও সার্কভূক্ত রাষ্ট্র ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা রোহিঙ্গা বিষয়ক বাংলাদেশের অবস্থানে সমর্থন দেয় নি বরং ভোট দানে বিরত থেকে আরাকানে মুসলিম গণহত্যা ও নিধনযজ্ঞে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভেদ খুবই সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো।
মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মুসলিম গণহত্যা ও জুলুম-নির্যাতন নতুন কিছু নয় বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মগ দস্যুরা নির্বিবাদে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছে। গত ২৫ আগস্ট বর্মী সামরিক বাহিনী ও মগ দস্যুরা যুগপৎভাবে আরাকান রাজ্যে নতুন করে গণহত্যা ও গণনিপীড়ন শুরু করে। হত্যা করা হয় অগণিত মানুষকে। অসংখ্য রোহিঙ্গা  মগদস্যুদের হাতে প্রাণ হারান। মসজিদ, মাদ্রাসা, বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। জীবন বাঁচাতে এসব ভাগ্যাহত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। উপর্যুপরি শরণার্থী শ্রোতে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা এখন ১১ লাখেরও বেশি। যা আমাদের দেশের মত জনবহুল ও স্বল্প আয়ের দেশের জন্য গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া। কিন্তু ভারতসহ সার্কভূক্ত কয়েকটি রাষ্ট্র আমাদের নিকট প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্রের দাবিদার হয়েও চরম প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও আমাদের অবস্থানকে সমর্থন করেনি। যা শুধু দুর্ভাগ্যজনকই নয় বরং সরকারের কুটনৈতিক ব্যর্থতা বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয়।  
জাতিসংঘের দেয়া তথ্যমতে আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী হচ্ছে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত নৃগোষ্ঠী। আর যুগের পর যুগ ধরে এই নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা চালিয়ে আসছে বর্মী মগ দস্যুরা। তারা মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে মগের মুলুকে পরিণত করেছে অনেক আগেই। আসলে ‘মগের মুলুক’ আমাদের দেশের একটি সুপরিচিত বাগধারা। বাংলা একাডেমি এর অর্থ লিখেছে, ‘ব্রহ্মদেশ বা আরাকান রাজ্য। অরাজক রাষ্ট্র, যে রাজ্যে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, যেখানে যথেচ্ছাচার হয়’। বস্তুত, বার্মিজরা ঐতিহাসিকভাবেই বর্বর, নির্মম ও নিষ্ঠুর। মানুষের গলায় দড়ি বাঁধা, হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া রাখাইনদের পুরনো অভ্যাস। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া ক্রোনিকলস’-এর বর্ণনায় জানা যায়, ১৭১৮ সালে বার্মার রাখাইন রাজা দক্ষিণবঙ্গ তছনছ করে অন্তত এক হাজার ৮শ সাধারণ অধিবাসীকে ধরে নিয়ে যায়।
বন্দিদের রাজার সামনে হাজির করা হলে রাখাইন রাজা সেখান থেকে বেছে বেছে এক দলকে তাঁর নিজের দাস বানায়। অবশিষ্টদের গলায় দড়ি বেঁধে ক্রীতদাস হিসেবে বাজারে বিক্রি করে দেয়। মগের মুলুক বলতে জোর যার মুলুক তার। এ বাগধারা মিয়ানমারের মগদের বর্বরতা ও দস্যুপনা থেকেই সূত্রপাত হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমাংশে তখনকার বাংলা বা বঙ্গদেশ খুব সমৃদ্ধ ছিল। ওই সময় দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ‘মগ’ জাতির দস্যুরা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে খুব লুটপাট ও ডাকাতি করত।
বর্তমানে যারা রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর আক্রমণ করছে, তাদের বলা হচ্ছে রাখাইন উপজাতি। এ রাখাইন উপজাতির আগের নাম ‘মগ’। সেই মগরাই ৪০০ বছর আগেও অত্যাচার ও লুটপাট চালাত। তখনকার আমলের মোগল সম্রাজ্যের রাজধানী দিল্লি থেকে নিযুক্ত, তৎকালীন বাংলা-প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থানকারী শাসনকর্তা বা সুবেদার, পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মগরা যা ইচ্ছা তাই করেছিল। অর্থাৎ তখন সরকার ছিল না, মোগলদের পরিবর্তে দেশের মালিক হয়ে গিয়েছিল মগ দস্যুরা। মুলুক শব্দটির অর্থ দেশ বা এলাকা। পর্তুগিজ নৌ-দস্যুদের সঙ্গে যখন আরাকানি বৌদ্ধরা হাত মিলিয়ে বাংলার উপকূলীয় এলাকায় সম্ভ্রমহরণ-লুণ্ঠন-হত্যার মতো জঘন্য কর্মে লিপ্ত হয় তখন থেকেই ‘মগ’ ও ‘মগের মুলুক’ জাতি ও দেশবাচক শব্দ দুটি অরাজকতার নামান্তররূপে ব্যবহৃত হতে থাকে।
সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে মগ দস্যুরা নতুন করে গণহত্যা ও নিধনযজ্ঞ শুরু ও রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার প্রেক্ষাপটে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। এতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান বন্ধ, তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং নাগরিকত্ব দেয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। আর জাতিসংঘের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ।
গত ১৬ নভেম্বর নিউইয়র্কে ভোটাভুটির পর এই প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যে মধ্যে ১৭১ সদস্য বৈঠকে উপস্থিত এবং ২২টি দেশ অনুপস্থিত ছিল। ভোটাভুটিতে অংশ নেয়া ১৩৫টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ১০টি দেশ।  উপস্থিত থেকেও কোনো পক্ষেই ভোট দেয়নি ২৬টি দেশ। এর অর্থ, বিরত থাকা দেশগুলো মিয়ানমারের গণহত্যাকে সমর্থন করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে চক্ষু লজ্জায় সরাসরি সেটার সাফাই গাইতে পারছে না। তাই মায়ানমারের বিপক্ষে দাঁড়ানো থেকে বিরত থেকেছে। বিপক্ষে ভোট দেয়া ১০টি দেশ হলো- রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, সিরিয়া, জিম্বাবুয়ে, কম্বোডিয়া, লাউস এবং বেলারুশ। এছাড়া মিয়ানমারের বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিল বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশি ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা। সার্কভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ। আর এই সমীকরণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ্ববাসীকে একটি অনাকাঙ্খিত বার্তাই দিয়েছে।
আমরা ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেই চিনেছি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় ভারত মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের বিপক্ষেই দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের এজেন্ডা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু গৃহীত হয়েছে। এতে ভোটাভুটির মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রস্তাব পাস করেছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো।
বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান বন্ধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহবান জানানো হয়। সেই সাথে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে আসার এবং তাদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। গত ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘে ৫৭ মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসির আহবানে এ ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ পরিষদের মানবাধিকার কমিটি এ ভোটাভুটি অনুমোদন করে।
রাখাইনে গণহত্যার শুরু থেকে ভারত সরকার এ ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে আছে দাবি করলেও এ ভোটাভুটিতে তারা অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত সরকারের অবস্থান ও ত্রাণ প্রেরণের নামে ‘ভানুমতির খেলা’ এখন সুষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে জাতিগত নিধন শুরু করে। তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় উগ্রবাদী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী। নির্বিচারে হত্যা, গণধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়ে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজারের মত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আক্রান্ত এ সব মানুষকে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ সরকার দেশটির সীমান্ত খুলে দেয় এবং তাদের পাশে দাঁড়ায়। যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মায়ানমার সরকারের অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ ‘জাতিগত বৈষম্যে’ রূপ নিয়েছে এমনটিই দাবি করা হয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে। গত ২১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি একথা জানিয়েছে। মিয়ানমার থেকে ৬ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার মূল কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের করুণ অবস্থা বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের খবরে বিভিন্ন দেশের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সৈন্যদের হাতে রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের বর্ণনা দিয়েছে।
মায়ানমার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে সম্প্রতি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেছেন, ঢাকার প্রস্তাবিত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণ করা তাদের পক্ষে ‘সম্ভব নয়’। ফলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। আসলে মায়ানমার এই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক কি না তা নিয়েও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ইতিমধ্যে গত ২৩ নভেম্বর এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, এটি আসলে কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২১ নভেম্বর অ্যামনেস্টির প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সরকারের বহু বছর ধরে চলা বৈষম্য ও নিষ্ঠুর দমনপীড়ন চলমান সংকট ডেকে এনেছে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একশ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের যেভাবে নিষ্ঠুর ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তা ‘বৈষম্যজনিত মানবতাবিরোধী অপরাধের’ সংজ্ঞায় পড়ে।
অ্যামনেস্টির সিনিয়র ডিরেক্টর ফর রিসার্চ অ্যানা নিসট্যাট বলেন, ‘মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এইসব রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অমানবিক ও চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করে চলেছে।’ বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে মুসলিম এই জনগোষ্ঠীটিকে চরম ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হয়। ১৯৮২ সালের দমনমূলক নাগরিক আইন প্রণয়নের পর থেকে তাদের ওপর এই বৈষম্য চলে আসছে। আইনটি প্রণয়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে সব ধরনের অধিকার হরণ করা হয়। তাদেরকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হয় না। দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। যা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অযৌক্তিক।
এদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে জরুরি বৈঠকে বসার জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ৩৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এসব সংস্থার মধ্যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০ নভেম্বর রাতে লেখা এক চিঠিতে বলেছে, “আমরা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের কাছে মিয়ানমারের ক্রম অবনতিশীল মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য অনতিবিলম্বে জরুরি বৈঠক ডাকার জোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কাছে এমন সময় এ আহ্বান জানানো হলো যখন সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গত ১০ নভেম্বর মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের নিন্দা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ বলেও অভিহিত করেন।
এ ছাড়াও জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ বিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী মার্ক লোকক সম্প্রতি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর হিসেবে অভিহিত করে বলেন, মিয়ানমার সরকার সেদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের কাছে ত্রাণ-সাহায্য পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেদেশের রাখাইন প্রদেশের মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে।
এ ছাড়া এই পাশবিকতা থেকে প্রাণে রক্ষা পেতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান। বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ মিয়ানমার সরকারের বাধার কারণে সেদেশে ত্রাণ পাঠাতে না পেরে বাংলাদেশে সাহায্য পাঠিয়েছে।
বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ যখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজছেন তখন চীনের ভূমিকাও বেশ রহস্যজনকই মনে হচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন তাতে রয়েছে তিনটি ধাপ। অস্ত্রবিরতি, সংলাপ ও উন্নয়ন। তিনি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশী দুই দেশ মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য কোন পরিকল্পনাই বর্তমান সঙ্কটের সমাধান করতে পারে। চীনের হস্তক্ষেপে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে।
অস্ত্রবিরতি: চীনা সরকারি বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার খবর অনুযায়ী, মি. ওয়াং তার পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রাখাইনে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঐ এলাকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের অন্যত্র চলে যেতে না হয়। তবে এই চীনা পরিকল্পনায় যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আছেন, তাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সরাসরি কোন কথা বলা হয়নি। যা মূল সমস্যাকে এড়ানোর অপকৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশ্বের আত্মসচেতন মানুষ।
শিনহুয়া বলছে, চীনা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে এই সঙ্কটের সবগুলো পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আলোচনার প্রক্রিয়া চালু রাখার তাগিদ দেয়া হয়েছে, যাতে 'সমতার ভিত্তিতে এবং সৌহার্দপূর্ণভাবে' সঙ্কটের সমাধান করা যায়।
উন্নয়ন: চীনা পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপে রাখাইনের উন্নয়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে রাখাইন রাজ্য প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কিন্তু সেখানে উন্নয়নের ধারা থমকে গিয়েছে। রাখাইনের উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা করার ব্যাপারেও চীনা পরিকল্পনায় তাগিদ দেয়া হয়েছে।
যাহোক গণচীন মায়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে যে পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা পেশ করেছে তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মায়ানমারের পক্ষেই যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর সদস্য রাষ্ট্রেগুলোর রোহিঙ্গা ইস্যুতে হীনমন্যতা কোন ভাবেই কাঙ্খিত নয়। জাতিসংঘের ভোটাভোটিতে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটান ভোট দানে বিরত থেকে প্রকারান্তরে মায়ানমারের মগদস্যুদের গণত্যায় নিরব সমর্থন জানিয়েছে। অথচ এসব রাষ্ট্র সার্কভূক্ত ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুর দাবিদার। বিশেষ করে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বের সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ভারত ভৌগলিকভাবে বৃহৎ রাষ্ট্র হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদারতার পরিচয় দিতে পারেনি। বরং তারা অতিপুরনো বৃত্তেই আটকে থেকেছে। আর সার্কভূক্ত দেশ শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানও ভারতকেই অনুসরণ করেছে। যা যৌক্তিক ও কাঙ্খিত হয়েছে বলে মনে হয় না।
[email protected]