বৃহস্পতিবার, ১৪-ডিসেম্বর ২০১৭, ০৪:১২ অপরাহ্ন

আগের সরকারের ভালো কাজের কথা ভুলেও মুখে আনা হয় না

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১২:৪৭ অপরাহ্ন

শামসুল আলম: সরকার যায় সরকার আসে। প্রকল্পের পর প্রকল্প আসে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পরে কেউ আর আগের সরকারের অবদানের কথা ভুলেও মুখে আনতে চায় না। বরং কতভাবে মানুষকে ভুলিয়ে রাখা যায়, সেই চেষ্টা থাকে প্রবল। সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পও তেমনি!
দেশের পর্যটন শিল্পকে সারা বিশ্বে পরিচিত ও আকর্ষণীয় করতে ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ২০৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পটি গ্রহণ করে। তখন আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার পদে কর্মরত। আমার স্মৃতিতে যতটুকু আছে, ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কক্সবাজার সফরে গিয়ে সমুদ্র দর্শন করতে গেলে হিমছড়ির পরে আর আগাতে পারেন নি। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সমুদ্র উপকুল জুড়ে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন জনসভায়। এছাড়াও কক্সবাজার পৌরসভাকে এ-মানের পৌরসভায় উন্নীত করে এডিবির বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পভুক্ত করেন, শহরে এবং বীচে সোডিয়াম বাতি লাগানো, কক্সবাজারে হাসপাতাল নির্মাণ, কক্সবাজার বিমান বন্দর চালু করার ঘোষণা দেন। বিশেষ করে ঐ সফরে আমাদের কলিগ কক্সবাজারের কৃতি সন্তান বিসিএস প্রশাসন সার্ভিসের কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব সালাউদ্দিন আহমদ নিজে উপস্থিত থাকায় (পরে তিনি সাংসদ, যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী, এবং বর্তমানে বিএনপির স্টান্ডিং কমিটির মেম্বার) প্রকল্পটিকে তিনি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যক্তিগত ভাবে উদ্যোগী হন। সালাউদ্দিন সাহেব নিজেই তখন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। ফলে মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির খাতের অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ অগ্রাধিকার হিসাবে দ্রুততার সাথে প্রকল্প তৈরী এবং তা একনেকের অনুমোদন লাভ করে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়। পরে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পের অগ্রগতি:
এক) ১৯৯৩ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ কক্সবাজার শহরের কলাতলী পয়েন্ট থেকে ড্রাইভের নির্মাণকাজও শুরু করে। কলাতলী মোড় থেকে নিরিবিলি হ্যাচারি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পর সাগরের প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের ধাক্কায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৯৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার বিশেষ করে যোগাযোগ মন্ত্রী কর্নেল অলি আহমেদের উদ্যোগে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় সেনাবাহিনীর প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়নকে। ১৯৯৩ থেকে ৯৫ সাল অবধি কলাতলী থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত সড়ক নির্মান কাজ শেষ হয়। এরপরে ১২ কিলোমিটার ব্রিক সোলিং কাজ সম্পন্ন হয়। ১৯৯৪ সালে বুয়েটের স্পেশাল টীমের দ্বারা রেজুখালিতে একটি বেইলি ব্রীজের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
দুই) ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে এই প্রকল্পের তেমন কোনো কাজ হয়নি। বরং প্রকল্পের কর্মচারীদের বেতন ভাতার বরাদ্দই ঠিকমত দেয়া হতো না।
তিন) ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস ও কক্সবাজার-১ আসনের সাংসদ সালাহউদ্দিন আহমদেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। তিনি নবউদ্যমে তাঁর নিজ এলাকার এই গুরুত্বপূর্ণ মেরিন ড্রাইভওয়ে প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর ১৬ প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়ন (ইসিবি) দিয়ে পূনরায় চালু করেন। মেয়াদকালে তিনি ৬/৭ বার প্রকল্প ভিজিট করেন। এ সময় সড়ক বিভাগের বরাদ্দ করা ৮ কোটি টাকায় ওয়াপদাকে ব্যবহার করে কলাতলির ২ কিলোমিটার ভাঙ্গন মেরামত করা হয়। কলাতলি পয়েন্ট থেকে ৪২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের ভার ছিল সেনা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের, আর শেষের ৪২ কিলোমিটার সড়ক বিভাগের। পরে সড়ক বিভাগকে বাদ দিয়ে পুরো কাজই ইসিবিকে দেয়া হয়। ২০০১-৬ সময়কালে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পুরো ৮৪ কিলোমিটার ড্রাইভওয়ের ভূমি অধিগ্রহণ এবং আর্থ ওয়ার্ক সম্পন্ন করা হয়। বাকি থাকে সড়ক পাকাকরণ।
চার) ২০০৭ সালের পর থেকে এই প্রকল্পের কাজে আবার শ্লথ গতি হয়ে পড়ে। শেষে ২০১৪ সালের দিকে সেনা ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড কাজ শেষ করার জন্য তাড়াহুড়া করতে থাকে এবং বরাদ্দ জোগাড় করে সফলতার সাথে প্রকল্প সমাপ্ত করে। নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ছয় সেনা সদস্য প্রাণ হারায়।
এই প্রকল্পটি মোট তিনটি ধাপে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রথম ধাপে জেলা শহরের কলাতলী থেকে উখিয়া উপজেলার ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার, দ্বিতীয় ধাপে ইনানী থেকে শিলখালী ২৪ কিলোমিটার ও তৃতীয় ধাপে শিলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এতে তিনটি বড় আরসিসি সেতু, ৪২টি কালভার্ট, তিন হাজার মিটার সসার ড্রেন ও ৫০ হাজার মিটার সিসি ব্লক এবং জিও টেক্সটাইল রয়েছে। তিনটি ধাপের নির্মাণকাজ শেষ করে গত ৬ মে বর্তমান সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন। কোন সরকারের সময়ে কতটুকু কাজ হয়েছে তা বিভিন্ন অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ, প্রকল্পের অর্থ ছাড়করণ এবং কাজের অগ্রগতির রিপোর্ট দেখলেই পরিস্কার হবে। তবে সেনাবাহিনী রক্ত এবং ঘামের, স্থানীয় মানুষদের ত্যাগ তিতিক্ষা এবং বিভিন্ন সময়ের সরকারের অব্যাহাত প্রচেষ্টার ফসল এই মেরিন ড্রাইভ সড়ক।
সমুদ্র ও পাহাড় ঘেরা সড়কটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে সড়কের পাশে নানা প্রজাতির প্রায় ১১ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোনালু, শিশুগাছ, নিমগাছ ও নানা প্রজাতির ফলদ গাছ। এছাড়াও সমুদ্র তীরবর্তী স্থানে প্রায় পাঁচ লাখ ঝাউগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। ওইসব চারাগাছ ক্রমেই বড় হয়ে সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। সাগর সৈকতের কুল ঘেঁষে তৈরি এই সড়কটি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিনোদনে উচ্ছ্বাস বাড়িয়ে দিবে। রাস্তার এক পাশে পাহাড় এবং অন্যপাশে সমুদ্র। একদিকে পাহাড়ী সবুজের সমারোহ; অন্যদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি। এমন স্বপ্নিল আবহ এ মেরিন ড্রাইভটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে পর্যটকদের কাছে।