বুধবার, ১৮-অক্টোবর ২০১৭, ০৫:১৩ অপরাহ্ন

শিশুদের বন্ধু হই

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট, ২০১৭ ১১:১৮ পূর্বাহ্ন

মু. তৌহিদুল ইসলাম: একদিন ক্লাসে ম্যাডাম সবাইকে ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ এই বিষয়ে লিখতে বললেন। লিখার নির্ধারিত সময় শেষ হলে ম্যাডাম সবার খাতা নিলেন ও আজকের মতো ক্লাস শেষ করে চলে গেলেন। বাসায় এসে তিনি সকল খাতা পড়ছিলেন, এর মধ্যে একটা খাতায় চোখ আটকে গেলো, লেখাগুলো পড়ে উনার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগলো। পাশে থাকা উনার স্বামী বিষয়টি লক্ষ্য করে এগিয়ে এসে বললো, কী হয়েছে? ম্যাডাম কথা না বলে খাতাটি এগিয়ে দিলেন। তিনি পড়ছেন, “আমার জীবনের লক্ষ্য হলো টেলিভিশন হওয়া। কারণ, আমাদের বাসায় যে টেলিভিশনটি আছে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় সবাই এর সামনে গিয়ে বসে। আর গভীর মনোযোগ গিয়ে টিভি দেখে! অনেক সময় খাওয়া-দাওয়ার কথাও মনে থাকে না! টেলিভিশনের না না অনুষ্ঠান দেখে তারা হাসি আনন্দে ফেটে পড়ে। দিনের বিভিন্ন সময় টিভির অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে নিজেরা আলোচনা করে। যদি টিভিটি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সেটি ঠিক করার জন্য সবাই উঠেপড়ে লাগে। আমি চাই টেলিভিশনের মতোই আমাকে সবাই গুরুত্ব দিবে। আমার দিকে মনোযোগী হবে। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে সবাই আমার যতœ নিবে। এ কারণেই আমি টেলিভিশন হতে চাই।” পড়া শেষে স্বামী বললো, ছেলেটি কতো দুর্ভাগা! নিশ্চয়ই তার বাবা-মা ও পরিবারের সবাই অনেক ব্যস্ত! তাকে কেউ সময় দেয়না। স্কুলের ম্যাডাম তখন বললো, তুমি মনে হচ্ছে খেয়াল করোনি, যে ছেলেটি লিখেছি সে আমাদেরই ছেলে!
এটি একটি গল্প হলেও এর ভেতরে এক গভীর হতাশাবোধ, হাহাকার ও নি:সঙ্গতা বিরাজমান। এখনকার সময়ের সাথেও রয়েছে এর যোগসূত্র। বর্তমানেও পরিবারের সবাই খুব ব্যস্ত। নগরায়নের ফলে মানুষের ব্যস্ততা যেমন বাড়ছে তেমনি মানুষও ধীরে ধীরে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপর। বড়দের তো বাইরে যাওয়ার ও নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ থাকে কিন্তু শিশুদের তেমনটি থাকে না। আবার এখন মাঠের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে শিশুরা আগের মতো খেলাধুলাও করতে পারছে না। যার কারণে তাদের বাসায় অবসরে অলস সময় কাটানো, টিভি দেখা, কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকা ও মোবাইলে গেমস খেলাটাই মুখ্য। কাজেই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থেই এখন তাদের বন্ধু হওয়া, তাদের জন্য পরিবারের সময় বরাদ্দ রাখা জরুরি।
বিগত তিন মাসে পত্রিকা খুললেই প্রতিদিন দেখা যাবে শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, পরকীয়ার বলি হওয়া, বখাটেদের উৎপাতে কিশোরীর আত্মহত্যা এবং এটি উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে! চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা এ জাতির জন্য লজ্জা ছাড়া আর কিছুই নয়! একটা শিশুর প্রতি যদি এ আচরণ করা হয় তাহলে জাতির ভবিষ্যত কী! আজকের শিশুরাই তো আগামীর নেতা ও চালক হবে। তাদের প্রতি যদি এ অবহেলা ও নিষ্ঠুর আচরণ করা হয় তাহলে জাতির জন্য অশনিসংকেত। কাজেই এ অবস্থার পরিবর্তনে নানা ধরনের ফর্মুলা আসতে পারে। আমি মনে করি, এর একটি সমাধান হতে পারে শিশুদের বন্ধু বানানো ও তাদের বন্ধু হওয়ার মাধ্যমে। বন্ধু হতে পারে রাষ্ট্র, পরিবার আর তাদের বন্ধুত্ব করিয়ে দেয়া যেতে পারে ভালো ও সৎকর্মশীল মানুষের সাথে। রাষ্ট্রকে হতে হবে শিশুবান্ধব, রাষ্ট্র তাদের জন্য নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থা করবে, উন্মুক্ত ও সবুজ মাঠে খেলাধুলা করার অবারিত সুযোগ তৈরি করে দেবে, শিশু সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও শিশুবিকাশ কার্যক্রম যুক্ত করবে। সেই সাথে সকল প্রকার শিশু নির্যাতনের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে। তাহলেই আমাদের চতুর্পাশে শিশুদের সাথে নিগ্রহের যে চিত্র প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাই তার সমাধান হবে। পরিবারের সবাই তাদেরকে উপযুক্ত সময় দেয়া ও অবসর সময়কে আনন্দময় করে তোলার উদ্যোগ নেবে, সেই সাথে শিশুরা কাদের সাথে মিশছে এরও খোঁজ রাখবে। ভালো ও মহৎ মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করিয়ে দেবে। আর আমাদেরও হতে হবে শিশুদের বন্ধু। হতে হবে সচেতন। কোথাও যেন শিশুরা নির্যাতন ও অবহেলার শিকার না হয় তার জন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে। তাহলেই একটি সুস্থ ও সুন্দর জাতি এবং আগামী দিনের সুন্দর সোনালী সুর্যের স্বপ্ন আমরা দেখতে পারবো। আমরা শিশুদের বন্ধু হবো-এই হোক বন্ধু দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক : শিশু সংগঠক ও কাউন্সিলর, বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদ, ঢাকা।