শনিবার, ২৫-নভেম্বর ২০১৭, ০৫:৩২ অপরাহ্ন

অবক্ষয়ের ভয়াল রূপ : ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১৬ জুলাই, ২০১৭ ০৬:৪১ অপরাহ্ন

সংস্কৃতি একটি জাতির বাহ্যিক পরিচয় বহন করে। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি, গোষ্ঠী, সমাজের মাঝে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে। একটি জাতি ভালো কি মন্দ তা আমরা বুঝতে পারি তার সংস্কৃতি দেখে। প্রত্যেক জাতির আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে। একজন মানুষ তার দেশের সংস্কৃতি তার মাঝে বপণ করেন এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- সংস্কৃতি বা প্রগতির নাম আধুনিকতা না-কি অশ্লীলতা?
আমরা জানি, দেশীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি ধর্মগত দিক দিয়েও মানুষের সংস্কৃতিতে পার্থক্য আছে। যেমন - একজন হিন্দু প্রত্যহ প্রভাতে স্নান করে জল খাবার খেয়ে ঘর থেকে বাহির হন। আবার অনেকে পূজা অর্চনাও করে থাকেন। আর কর্মস্থলে গিয়ে ধূপ জ¦ালিয়ে নতুন দিন আরম্ভ করেন, এটা তাদের সংস্কৃতি।
অন্যদিকে একজন মুসলিম সুবহে সাদিকে ঘুম হতে ওঠে ওযু বা গোসল সেরে নামাজ আদায় করেন। পরে সকালের নাশতা খেয়ে বিসমিল্লাহ বলে কর্মক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন। সুতরাং এখানে পার্থক্য বিদ্যমান।
আমরা বাংলাদেশি। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বেশ পরিচিত। দেশটি একটি স্বাধীন ও মুসলিম দেশ হিসেবে ঐতিহ্য অনেক। আমাদের সংস্কৃতি হবে অবশ্যই নান্দনিক ও সুন্দর। সংস্কৃতিমনা হওয়াও আমাদের উচিৎ। সংস্কৃতি জাতির প্রাণ। সংস্কৃতি বলতে শুধু বাদ্যযন্ত্র, গান-বাজনা, টেলি ছবির নয়। সংস্কৃতি বলতে রক গান নাচানাচি নয় কিংবা বিপরীত লিঙ্গের সাথে খোলামেলা চলাফেরা নয়। আমার সোনার বাংলাদেশ আমি আমার অস্তিত্ব দিয়ে দেশকে অবশ্যই ভালবাসবো। দেশপ্রেম যার নাই সে মানুষ হিসেবে গণ্য হয় না। আমার দেশের সংস্কৃতিই আমার পরিচয় বহন করবে। ভিনদেশী কোনও সংস্কৃতি আমি মোটেও অনুসরণ করতে পারি না। এটা লজ্জাকরও বটে।
কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভয়াল নীল থাবায় আচ্ছাদিত। তাদের টেলিভিশন চ্যানেল আমাদের দেশে পারমিট দেয়া হয়েছে, যা নিতান্ত ঘৃণার বিষয়। তাদের কালচার আমাদের জন্য ক্যানসারের মতো। ভারতীয় নগ্ন ফিল্ম আমাদের দেশের উঠতি বয়সী ছলে-মেয়েদের জন্য অত্যান্ত ভয়ানক বিষয়। এই ফিল্ম থেকে শেখার চাইতে নষ্টামী শেখাই সহজ। আজকের নবীন প্রজন্ম আগামী দিনের সোনালী ভবিষ্যত। এই ছেলে মেয়ে হতেই তৈরি হতে পারে শাহ্ মাখদুম, শহীদ তিতুমীর, হাজী শরিয়ত উল্লাহ্ বা ফজলুল হকের মতো মহান নেতা। তাদের চরিত্র হবে পাপ ও কুলষ মুক্ত। কিন্তু ভারতীয় এই ফিল্ম যদি হারমেশাই এ দেশে চলতে থাকে তবে দেশের ভবিষ্যৎ শূন্যের কোঠায় উঠবে। পত্রপত্রিকায় শত শত প্রতিবাদ ও মন্তব্য অহরহ লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু তাতে কোনও ফল হচ্ছে না। সরকার এ দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না।
আমাদের দেশের টেলিভিশন চ্যানেল ভারত মোটেই দেখে না। আর আমরা লজ্জাহীনদের মতো দেখি, কোনও বোধগম্য উদোয় হয় না। বিদেশি চ্যানেলের চেয়ে আমাদের দেশের চ্যানেল অনেক মানসম্পন্ন যা আইএসও-৯০০০ সনদ পেয়েছে। বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখলেই বুঝা যাবে সভ্যতা কোথায় যাচ্ছে।
কী দিচ্ছি আমরা আমাদের প্রজন্মকে? কী শেখাচ্ছি আমরা আমাদের সন্তানদের? একটি জরিপে দেখা যায় একটি স্কুল পড়ুয়া মেয়ে সপ্তাহে গড়ে ৫০ ঘণ্টা ভারতীয় চ্যানেল দেখে। যা তার মনে ভালো কিছু দিতে পারছে না। আর পাশ্চাত্য ইউরোপীয় দেশের অবস্থা আরো কঠিন।
আমি ছবি দেখার বিরুদ্ধে বলব নাএ বললে অনেক পাঠকই আমাকে মৌলবাদী ভাবতে পারেন। আমি বলবো, আনন্দ ও বিনোদনের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য আমরা দেশীয় বিনোদন দেখতে পারি। যেমন- বাংলা নাটক, আমাদের সন্তানদের দিতে পারি বিনোদনমূলক কার্টুন, বিভিন্ন ডুকুমেন্ট, গল্প, কমিকস ও ছোটদের বিভিন্নধরনের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান। আমারা সচেতন হলে কখনো নোংরা পথে যেতে পারে না আমাদের সন্তান। একজন সুসভ্য মা একটি নৈতিক ও সত্য সভ্য জাতি উপহার দিতে পারেন। একজন আদর্শ মা সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ। আর একটি আদর্শবান ও সভ্য মেয়েই একটি সৎ চরিত্রের সন্তান দিতে পারে।
পশ্চিমা বিশ্বে ঘণ্টায় ১০০ জনের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। স্কুল জীবন পার না হতেই ৯৬% মেয়ে তার কুমারীত্ব হারিয়ে ফেলে। সভ্যতা কি একেই বলে? আমাদের প্রতিবেশী ভারতে শতকরা ৪৯% বেশি নারী বিয়ের পূর্বে গর্ভপাত ঘটায়। সেসব দেশের ‘যৌন রঙ্গ ফিল্ম’ তাদের ও আমাদের টিনএজআর’দের ধ্বংস করে দিচ্ছে। সরকার আবার নতুন করে ভাতীয় ফিল্ম বাংলাদেশে প্রচারে পারমিট দিয়েছে। কী হবে? কী শিখবে আগামী প্রজন্ম? হাজারো প্রতিবাদে কোনও সফলতা আসেনি।
আমার এ লেখায় করাপসন বন্ধ হবে না, তা জানি। তবে আমাদের উচিৎ আমাদের সন্তানদের প্রতি ও ছোট ভাই- বোনদের প্রতি খেয়াল রাখা।  তাদের মোবাইল সেটে কী আছে, কোচিংয়ের নামে বোনটি কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে বন্ধুত্ব করছে তা মনিটরিংয়ে রাখা। সেই সাথে বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল প্রচার অবশ্যই নিষিদ্ধ করতে সরকারকে চার প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। পৃথিবীতে জ্ঞানের জন্য চলচ্চিত্রের আবশ্যিকতা নেই।
যদিও অতি জীবনধর্মী ও শিক্ষণীয় নান্দনিক, জীবন গঠনমূলক মানুষ্যত্ববোধ উদয়ের ফিল্ম তৈরিতে কোনও দ্বিমত আমার নেই। আমার লেখা পড়ে হয়তো অনেকে কঠিন মন্তব্য করতে পারেন। তবে কথাগুলো বাস্তব। আজে-বাজে ছবি দেখে প্রায়ই তরুণ-তরুণীরা বিপথে চলে যায় আর মনে মনে রোমান্টিক ভাব নেয়। মনে জন্ম নেয় প্রেম প্রেম ভাব আর এতেই সৃষ্টি হয় নানান অসম্মানের ঘটনা। ধর্ষণ, আপত্তিকর ভিডিও, ব্ল্যাকমেইলের মতো নানান ঘটনার সূত্রপাত ওইসব আজে-বাজে ছবিই। সুতরাং ভারতীয় ভয়াবহ নীল থাবা হতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ নবীবন প্রজন্ম যা উপভোগ করে, যা দেখে, যা শিখে তা বাস্তবে রূপদান করতে চায়। আর এভাবেই আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে হিন্দি সিরিয়ালসমূহ। হিন্দি সিরিয়ালগুলো অনেককেই কর্মবিমুখ করছে। বিশেষ করে মেয়েদেরকে মেধাশূন্য করে দিচ্ছে। এতে ভাঙ্গন বাড়ছে যৌথ পরিবারে। আর হিংসা পরায়ন হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
এদিকে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ যুবক যুবতীদের একান্তে সময় কাটানোর ব্যবস্থা রয়েছে রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহরে। শিক্ষার্থীসহ তরুণ-তরুণীদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য রাজধানীসহ বড় বড় শহরে রয়েছে নানা ধরনের আয়োজন। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন পার্ক, ফাস্টফুড দোকানসহ অনেকে বাহারি নামের অনেক দোকান খুলেছে সুবিধাভোগীরা। যা অবৈধ প্রেমকানন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব স্পটে থাকে একান্তে মেলামেলার জন্য ছোট ছোট রুম। রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন উপলক্ষে এসএসসি, এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী মিলে মাঠে, প্রকাশ্য রাজপথে নৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। যে ভিডিও দৃশ্য ধারণ করে ছেড়ে দেয়া হয় ইন্টারনেটে। সমবেত নাচের সময় ছাত্রছাত্রীরা যেসব অঙ্গভঙ্গি করছে, অনেকের মতে তা অশ্লীলতা ছাড়া আর কিছু নয় এবং রীতিমতো উদ্বেগজনক। পুরোপুুরি হিন্দি সিনেমার আদলে করা হয়েছে এসব নাচের অনুষ্ঠান। লজ্জাহীনতা বর্তমানে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার জন্য স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া অনেক তরুণী অশালীন নাচের ভিডিও করে তা ছেড়ে দিচ্ছে ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
প্রযুক্তির প্রসার ও সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের কারণে তরুণ সমাজে খুব দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড এবং দোস্ত কালচার। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিদেশি টিভি চ্যানেল, দেশীয় টিভি-সিনেমা এবং নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যা দেখানো হচ্ছে তা অবাধ মেলামেশা ও লজ্জাহীনতার প্রসারের ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন অনেকে। পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগে পর্নোগ্রাফির বিস্তার এবং নারী-পুরুষ সংস্পর্শে আসার কারণে লজ্জা ও নৈতিকতার বাঁধন দ্রুত শিথিল হয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে লজ্জাহীনতার সংস্কৃতি। ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে অবাধ মেলামেশার পরিবেশ। বিয়েবহির্ভূত যৌনতা বিষয়ে ধর্মীয়, পারিবারিক এবং সামাজিক রীতিনীতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের ভালোবাসা ভালোলাগা আজকাল দ্রুত গড়াচ্ছে শারীরিক সম্পর্কে পর্যায়ে।
পরিশেষে বলবো, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বাঙালিপনার দোহাই দিয়ে যেভাবে প্রাশ্চাত্যের সংস্কৃতির অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ ভেসে যাচ্ছে, সেটা কখনো হাজার বছরের যে বাঙালি সংস্কৃতির সংজ্ঞায়ন দেওয়া হয় তার সাথে মেলানো যাবে না। তাই এসব থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতেই হবে।
(লেখক: এম আরমান খান জয়, গোপালগঞ্জ, ০১৯৫২৫১৮০৮২)