শুক্রবার, ২৮-জুলাই ২০১৭, ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন
| প্রকাশ : ১০ জুলাই, ২০১৭ ০৬:৫৩ অপরাহ্ন

পাক-মার্কিন সম্পর্ক কি চূড়ান্তভাবেই ভেঙে যাচ্ছে?

পাকিস্তানকে ‘মিত্র’ দেশের মর্যাদা থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে আমেরিকা। এ লক্ষ্যে এরইমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান ও বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি বিল আনা হয়েছে। বিলটি পাস হলে ন্যাটো জোটের বাইরের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের তালিকা থেকে পাকিস্তানকে বাদ দেয়া হবে। যে দুই কংগ্রেসম্যান বিলটি এনেছেন তারা বলছেন, যেহেতু পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে নি সে কারণে দেশটি আর মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য পাওয়ার অধিকার রাখে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন আমেরিকা সফরে যাচ্ছেন তার আগ মুহূর্তে এ বিল তোলা হলো। এছাড়া, ভারতে মার্কিন অত্যাধুনিক এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান তৈরি করা হবে বলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

২০০৪ সালে সে সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ পাকিস্তানকে ‘ন্যাটো জোটের বাইরের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র’ দেশের মর্যাদা দিয়েছিলেন। সে সময় আল-কায়েদা ও তালেবানের বিরুদ্ধে কথিত লড়াইয়ে পাকিস্তানকে উৎসাহিত করার জন্য বুশ প্রশাসন এ ব্যবস্থা নিয়েছিল। এখন নতুন এই বিল যদি পাস হয় তাহলে আমেরিকা ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।  

ন্যাটো জোটের বাইরের মিত্র দেশের মর্যাদা থাকার কারণে পাকিস্তান বিদেশী আর্থিক সহায়তা ও সামরিক সহযোগিতা পেত। এছাড়া, দেশটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুবিধা পেত। পাশাপাশি মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের সংগ্রহ গড়ে তুলতে, প্রতিরক্ষা গবেষণা কর্মসূচিতে অংশ নিতে এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র কিনতে পারত।

বিল উত্থাপনকারী রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসম্যান টেড পো বলেছেন, “আমেরিকার রক্তে পাকিস্তানের হাত রঞ্জিত এবং এজন্য তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।” এ বিল আনতে তার সঙ্গে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট দলের কংগ্রেসম্যান রিক নোল্যান।

টেড পো হচ্ছেন মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য এবং সন্ত্রাসবাদ, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও বাণিজ্য বিষয়ক সাব কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে আমেরিকার জেনারেল বেনেডিক্ট আরনল্ডের মতো ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বেনেডিক্ট আরনল্ড ছিলেন ১৮ শতকের মার্কিন জেনারেল যিনি পক্ষ ছেড়ে ব্রিটিশ বাহিনীতে চলে যান।

টেড পো আরো বলেন, “ওসামা বিন লাদেনকে গ্রেফতার করা থেকে তালেবানকে সমর্থন করা-সবকিছুতেই পাকিস্তানের হাত রয়েছে এবং তারা এ শক্তির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পন্থায় লড়াই করতে চায় নি; কঠিনভাবে অস্বীকার করে এসেছে।”

পাকিস্তান-বিরোধী বিল আনার বিষয়ে টেড পো সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তবে তার বিল সাধারণত অন্য কংগ্রেসম্যানরা নাকচ করে থাকেন। এবারের বিলও পাস হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন। পত্রিকাটি বলছে, আফগানিস্তানে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকার কারণে কংগ্রেসম্যানরা এ বিল আটকে দিতে পারেন কারণ এসব সেনার জন্য রসদ পাঠাতে আমেরিকা এখনো পাকিস্তানের স্থলপথ ব্যবহার করছে।

অবশ্য এ বিল উত্থাপনের পর যে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসছে তা হলো- ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান-বিরোধী সামরিক অভিযানের সময় থেকে আফগান সীমান্তে পাকিস্তান হাজার সেনা মোতায়েন করে রেখেছে এবং সীমান্তে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে পাকিস্তানের ৬০০০’র বেশি সেনা নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের এই ত্যাগের তাহলে কী মূল্য হলো? পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর এই আত্মত্যাগকে একেবারেই বিল উত্থাপনকারীরা বিবেচনায় নেন নি।

টেড পো সুস্পষ্ট করে বলেছেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের পরিষ্কারভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে যাতে তারা ঘনিষ্ঠ মিত্রের মর্যাদা ব্যবহার করে আমাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনার সুবিধা না পায়।”

টেড পো’র সঙ্গে সুর মিলিয়ে ডেমোক্র্যাট দলের কংগ্রেসম্যান নোল্যান বলেছেন, “বার বার পাকিস্তান আমেরিকার সুখ্যাতির সুযোগ নিয়েছে কিন্তু আমেরিকার মিত্র নয়- এমনভাবে কাজ করেছে। পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ধরে আমেরিকার কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার নিয়েছে কিন্তু মার্কিন নিরাপত্তার জন্য সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে কিছুই করে নি।”

নোল্যান বলেন, “এখন সময় এসেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর, যে কিনা লড়াইয়ের নাম করে একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছে। এই বিল মার্কিন ট্যাক্স প্রদানকারীদের ডলার এবং আমেরিকা ও বিশ্বকে নিরাপদ করবে।”

এদিকে, মার্কিন এই বিল পাস হলে তার কী প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে -স্বাভাবিকভাবেই এমন প্রশ্ন উঠেছে। এই বিল উত্থাপনের পর কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, মিত্রদের ব্যবহারের পর মার্কিন প্রশাসন ছুঁড়ে ফেলার যে নীতি যুগ যুগ ধরে অনুসরণ করে আসছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও তাই হতে চলেছে। তারা মনে করছেন, রাশিয়ার সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের দিন দিন যে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে চলেছে তা মার্কিন রাজনীতিকরা ভালো চোখে দেখছেন না। এছাড়া, সৌদি নেতৃত্বাধীন কথিত ইসলামি সামরিক জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে দোটানায় রয়েছে পাকিস্তান। এ ক্ষেত্রে মার্কিন এই বিল ইসলামাবাদের ওপর বিশেষ চাপ সৃষ্টি করতে সহায়তা করবে এবং পাক সরকার সৌদি জোটে যোগ দিতে বাধ্য হবে বলে আশা করছেন মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা।

অন্যদিকে, চীন সাগর ও উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে বেইজিংয়ের সঙ্গে চরম টানাপড়েন চলছে আমেরিকার। সেখানে পাকিস্তান হচ্ছে চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র। এছাড়া, আফগানিস্তান ইস্যুতেও চীন ইদানিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যা আমেরিকা সুনজরে দেখছে না। আবার কৌশলগত দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদার বন্দরে চীনের উপস্থিতির সুযোগ করে দিয়েছে পাকিস্তান। সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কথিত আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক জোটে সেনা পাঠায় নি। এসব ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মার্কিন সরকারের ইচ্ছামতো পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা পালন করছে না। ফলে, পাকিস্তানকে এখন হয়ত তারই মূল্য দিতে হবে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার দিন দিন সম্পর্ক বেড়ে চলেছে যা ইতিহাসের অনেকটা বাঁক ঘুরে যাওয়ার মতো ঘটনা। অনেক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এই মূল্য চুকিয়ে নেয়ার সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন সরকার পাকিস্তানের অভ্যন্তর থেকে ওসামা বিন লাদেনকে আটকের ঘটনাও ঘটিয়েছে। মার্কিন এ চাপ ইসলামাবাদ কীভাবে মোকাবেলা করে তা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে- চীন ও রাশিয়ার সমর্থনের কারণে পাকিস্তান অনেকটাই নিরাপদ অবস্থানে থাকতে সক্ষম হবে।