শনিবার, ২৫-নভেম্বর ২০১৭, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন

যৌতুক সামাজিক ব্যাধি: উত্তরণে করণীয়

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট, ২০১৭ ০৭:৫৯ অপরাহ্ন

মোঃ আমানুল্লাহ আমান: যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। বর্তমানে বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা এক ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আইন থাকা সত্ত্বেও প্রায়োগিক দুর্বলতার কারণে যৌতুক প্রথা সমাজ থেকে সমূলে উৎপাটন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পরিকল্পনা প্রণয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী বিবাহের এক পক্ষের দ্বারা অপর পক্ষের প্রতি বিবাহের পূর্বে, বিবাহের সময়ে বা বিবাহের পরে যে কোন সময়ে বিবাহের প্রতিদান বা পণ হিসেবে দিতে সম্মত হওয়া সম্পদ বা জামানতকে যৌতুক হিসেবে বোঝান হয়েছে। আমাদের সমাজের এ সভ্য যুগেও বিপুলসংখ্যক নারী প্রতিনিয়ত যৌতুক দিতে না পারায় সহিংসতা ও অবমাননাকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। দারিদ্রতা এবং নারী শিক্ষার অভাবসহ সামাজিক রেওয়াজ, সচেতনতার অভাব, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সহজ উপায় এবং বস্তুগত প্রাপ্তির লোভ-লালসা, পাত্র পক্ষের ব্যবসায়িক মনোভাব, নারীদের নিম্ন সামাজিক মর্যাদা, যৌতুক নিরোধ আইনের প্রায়োগিক দুর্বলতা বা এ আইন সম্পর্কে জনগোষ্ঠীর ধারণা না থাকা বা কম থাকা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে এ প্রথা সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় সমাজের গভীরে প্রবেশ করেছে।
যৌতুকের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা এখন প্রায়ই খবরের শিরোনাম হচ্ছে। এ যৌতুক প্রথা সমাজ থেকে উচ্ছেদের জন্য এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এজন্য যৌতুক নিরোধ আইন এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করতে হবে।
যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ যৌতুকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বিবাহের আগে বা পরে এক পক্ষ অপর পক্ষের নিকট থেকে যে কোন প্রকার অর্থ বা জিনিসপত্র দাবি করলে তা যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে। উল্লেখ্য যে, বিবাহে কোন পক্ষ ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি বিবাহের সময় বিবাহের কোন পক্ষকে প্রদত্ত কোন উপহার (জিনিসের মাধ্যমে) যার মূল্য পাঁচশত টাকা অতিক্রম করে না, এতদ্বারা অনুসারে তা যৌতুক হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। বিবাহের কোন পক্ষ বাধ্য হয়ে যা (টাকা বা দ্রব্যাদি) প্রদান করে বা না দিলে পক্ষগণের মধ্যে সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এবং নির্যাতন শুরু হয় তাই যৌতুক। যৌতুক (অর্থ বা দ্রব্যাদি) প্রদান বা গ্রহণ এবং এ কাজে সহযোগিতার করার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর শাস্তির বিধান করা আছে এবং কোনক্রমেই শাস্তি এক বছরের কম দেয়া যাবে না। আবশ্যক হলে কারাদণ্ড/অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডই দেয়া যাবে। এ কারাদণ্ড সশ্রম বা বিনাশ্রম হবে কি না তা ম্যাজিস্ট্রেট অবস্থানুসারে বিবেচনা করবেন। সমাজে যৌতুক জনিত অপরাধ বৃদ্ধি নিবারণের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এছাড়াও যৌতুক আদান বা প্রদানের চুক্তি অবৈধ। যৌতুক আদান বা প্রদানের কোন চুক্তি বৈধ হবে না। তবে অপরাধের তারিখ হতে এক বছরের মধ্যে অভিযোগ করা না হলে কোন আদালত এরূপ অপরাধ আমলে আনয়ন করবেন না। যদি বাদী ও বিবাদী আপোষ করতে আগ্রহী হয় তা হলে আপোষ করতে পারবে। বস্তুত পারিবারিক মামলা আপোষ নিষ্পত্তি বেশী কল্যাণকর। এ ধরণের মামলায় আপোষ করার জন্য পক্ষগণকে উৎসাহ দেয়া উত্তম। এ আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।

যৌতুক নিরোধে সামাজিকভাবে ও ইউনিয়ন পরিষদের যা করুণীয়:

এক. যৌতুক প্রথা উচ্ছেদের জন্য সামাজিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ব্যক্তি, পরিবার এবং সামাজিক জীবনে সকলকে সর্ব প্রকার যৌতুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে এবং এ বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে।
দুই. যৌতুক বিরোধী আইনের বহুল প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিন. সমাজে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে, যৌতুক একটি নিপীড়ন, অসম্মানজনক ও লজ্জাজনক বিষয়।
চার. বিবাহে নিবন্ধন বাধ্যতামূলকভাবে এবং নিকাহ নামায় যৌতুক লেন-দেন না করার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পাঁচ . নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ছয়. যৌতুক নিরোধে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদের সভায় যৌতুক প্রথা প্রকোপ, ইউনিয়নের বর্তমান অবস্থা, ইউনিয়নবাসীর এ বিষয়ে বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি এবং এ সম্পর্কে বাস্তব চিত্র কি তা জানতে হবে। বেইজ লাইন সার্ভের মাধ্যমে এ তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। ইউনিয়নে মনিটরিং সেল গঠন করে বেইজ লাইন সার্ভের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে এবং হালনাগাদ রাখতে হবে।
সাত. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউনিয়নে বা অন্য কোন নির্ধারিত স্থানে সভা-অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রকারের প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- র‌্যালি, বিভিন্ন প্রকার প্রতিযোগিতা, গান, নাটক মঞ্চায়ন এবং জনসভায় যৌতুকের কুফল সম্পর্কে বাস্তব চিত্র উপস্থাপনা করা যেতে পারে।
আট. ইউনিয়নে ওয়ার্ডভিত্তিক  যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
নয়. ধর্মীয় অনুশাসন সঠিক ও যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য মক্তব, মাদ্রাসার শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম সাহেবদের মাধ্যমে যৌতুক বিরোধী আলোচনা অনুষ্ঠান এবং সে সকল অনুষ্ঠানে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ থাকতে পারে।
দশ. যৌতুকের বিবাহ বয়কট করা এবং যৌতুক বিরোধী কার্যক্রম ও যৌতুক লেনদেন  বন্ধে ব্যক্তিপর্যায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

মূলত যৌতুক পাবিারিক জীবনে চরম কলহের সৃষ্টি করে। দীর্ঘকাল থেকে এই প্রথার প্রচলন থাকায় এটি এখনো কোনো কোনো এলাকায় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এর থেকে বের হতে শুধু নারীরাই নন, পুরুষরাও উদ্যোগী হতে হবে। ‘যৌতুক নেবো না, দেবো না’ যদি এমন একটি শ্লোগান সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে এর একটি প্রভাব সব মহলেরই দৃষ্টিতে আসবে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে যৌতুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারলে ক্রমেই এর কুপ্রভাব কমে আসবে।

লেখক: কবি ও এনজিও কার্যক্রম বিশ্লেষক।