সোমবার, ২৫-সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১:১১ অপরাহ্ন

কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি জেনারেল ওসমানী

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট, ২০১৭ ০৬:২২ অপরাহ্ন

শেখ আখতার উল ইসলাম: আগামী ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর ৯৯তম জন্মদিন। ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ভারতবর্ষের সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমা শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার এই বলিষ্ঠ বীর সেনানী বাঙ্গালী জাতিসত্তার অভ্যূদ্বয়ের অন্যতম মহানায়ক ও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান সিপাহসালার ছিলেন।
তার জীবদ্ধশায় কোন যুদ্ধে তিনি পরাজিত হননি। জীবনের সব ক্ষেত্রে সফল এ বীরযোদ্ধা কখনো কোনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। দেশি-বিদেশি চক্রান্তের শিকারে পরিণত হলেও কখনো হার মানেনি, অন্যায়ের কাছে তিনি কখনোই মাথা নত করেননি।
বাংলাদেশকে আতুড় ঘরে নিঃশেষিত করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত রুখে দিয়ে তিনি একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন প্রতিকূল পরিবেশে জন্ম নেয়া বাংলাদেশকে।
পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের মুক্তি ও অধিকার অর্জন, শোষণ-বঞ্চনা, নিপীড়ন, নির্যাতন, অন্যায়, অসত্য আর অসুন্দরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর এবং সুখী, সমৃদ্ধ সুন্দর পৃথিবী গড়তে যে সকল মহামানব যুগে যুগে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি তাদেরই একজন। মানবসমাজে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা ওসমানী সমাজ-সভ্যতা ও মানবতাকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। ব্যক্তি জীবনে নির্লোভ, সাহসী, নিরহঙ্কার, বিনয়ী, স্পষ্টবাদী, সত্যবাদী, দৃঢ়চেতা, কর্মঠ, ন্যায়নিষ্ঠ, সৎ ও ত্যাগী বঙ্গবীর তখনই অস্ত্র ধরেছিলেন, যখন পরাধীনতার নাগপাশে বন্ধী ভারতবর্ষ মুক্তির প্রহর গুনছিলো।
রাম ছাড়া যেমন রামায়ন হয়না তেমনি বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা চিন্তা করা যায় না। বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবীর আর বাংলাদেশ একই সুতোয় গাঁথা। এই শব্দ তিনটি অভিচ্ছেদ্য ও অভিন্ন।
বাংলাদেশ যখন পাকিন্তান নামক একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্রের অংশ। তখন বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার অভ্যূদ্বয়ের মহানায়ক অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে যোগদানের আহ্বান জানালেন কর্নেল (অবঃ) ওসমানীকে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দীর্ঘ বৈঠক শেষে ওসমানী আওয়মী লীগে যোগ দেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম নির্বাচনী এলাকা (সিলেটের-গোলাপগঞ্জ, ফেচুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলা নিয়ে গঠিত) থেকে বিপুল ভোটে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করলে ওসমানী সিংহের মতো গর্জে উঠেন। তারই হাতে গড়া বঙ্গশার্দুলদের নিয়ে তিনি প্রাক্তন সৈনিক সংস্থা গড়ে তুলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার পরের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ, বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে ঘুমন্ত বাঙ্গালী জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। শুরু হয় বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার অভ্যূদ্বয়ের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ।
গোটা জাতি সেদিন তাকে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় বরণ করে নেয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে।
ইতিহাস বলে, জেনারেল ওসমানী সাহস ও বুদ্ধিমত্তার সাথে গড়ে তুলেছিলেন মুক্তিবাহিনী। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সহায়তায় তিনি পরাজিত করেন পরাশক্তির মদদপ্রাপ্ত আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীকে। কৃতজ্ঞ জাতি তাকে সে দিন গৌরবের প্রতীক “বঙ্গবীর” খেতাবে ভূষিত করেছিল। অতঃপর ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল সেনাবাহিনীর পূর্ণ জেনারেল পদমর্যাদায় তিনি “সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক” এর পদ থেকে  অবসর গ্রহণ করেছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একজন জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ সংসদ সদস্য হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নৌ ও বিমানমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুণর্গঠনে  আত্মনিয়োগ  করেন।
বঙ্গবীর ওসমানী ছিলেন গণতন্ত্রের আপোষহীন সৈনিক। মানুষের সেবাকেই জীবনের ব্রত রূপে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনের এক হাসপাতালে ১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চিরকুমার ওসমানী মৃত্যুর পূর্বেই তার সমস্ত সহায় সম্পত্তি জনকল্যাণে দান করে যান। তিনি কোন সহায় স¤পদ রেখে যাননি, রেখে যাননি তার কোন উত্তরাধিকার। তবে রেখে গেছেন অসাধারণ-অনুকরণীয় এক জীবনাদর্শ।
শীর্ষনিউজ//লেখক//এআর