সোমবার, ২৫-সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১:১১ অপরাহ্ন

জ্বী স্যার, জুতা পালিশ করা প্রবাসী কামলা বলছি

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

আহমেদ আরিফ: বাংলা একাডেমী পুরষ্কার প্রাপ্ত কবি এবং সাংবাদিক আবু হাসান শাহরিয়ার ৩রা সেপ্টেম্বর ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসে লিখেন ' বাপু হে, ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয় ! প্রবাসে বসে বাঙালকে হাইকোর্ট চিনিয়ো না। কথায় কথায় রেমিটেন্সের গল্প কেন শোনাও? বিদেশিদের জুতাপালিশ করতে গেছ; সেই কাজটাই মন দিয়ে করো। আয়-উপার্জন আরো বেশী হবে। ওই উদ্দেশ্যেই তো স্বদেশের মায়া ত্যাগ করেছ। তবে আর দেশের জন্য মায়াকান্না কেন? '
প্রবাসী বাংলাদেশীদের এবং বাংলাদেশে বসবাসরত সচেতন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের  তীব্র সমালোচনার পর কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের ওয়ালে পোস্টটি আর দেখিনি। সম্ভবত উনি পোস্টটি মুছে ফেলেছেন অথবা ওয়াল থেকে অনলি মি করেছেন। এমনও হতে পারে শুধুমাত্র উনার ফ্রেন্ডলিস্টের বন্ধুরা দেখতে পারবে এমন প্রাইভেসী দিয়ে রেখেছেন।
ঈদের সময় এমনিতেই প্রবাসীদের মন খারাপ থাকে। তার ওপর ঈদের পরদিন এমন স্ট্যাটাস দেখে যে কারোই খারাপ লাগবে। প্রবাসে ক্লিনার থেকে শুরু করে অফিসের ভালো ভালো পোস্টে কর্মরত প্রবাসী সবারই ঈদ বলে আদৌ কিছু নেই। অন্য দশটা দিনের মতই লাখ লাখ প্রবাসীকে ঈদের দিনও কাজ করতে হয়। এটাই বাস্তবতা। ব্যবধান শুধু কেউ হয়ত বাইরের রোদে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ক্লিনিংয়ের কাজ করছে; কেউ এসির নিচে বসে অফিসে কাজ করছে; কেউ দোকানে কাজ করছে। সব পেশারই প্রবাসীদের বড় একটি অংশ ঈদের ছুটির দিনও কাজ করে !
ব্যাংক রিলেটেড প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ঈদের দিনও ব্যাংককে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিতে হয় আমাদের কোম্পানির। একরকম বাধ্য হয়েই তাই ঈদের বন্ধেও অফিস করেছি । যদিও ওভার টাইম। কিন্তু, টাকা দিয়ে কি সব হয়? হয়না। যদি হত তাহলে ঈদের দিন শুধু কেক আর কোল্ড ড্রিংক খেয়ে থাকতে হত না।
সৌদি আরবের ঈদের দিন বাসার আশপাশের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ ছিল। তাই দুপুরে এক পিস কেক আর একটা কোল্ড ড্রিংক খেয়েই দিন পার করেছি!
অথচ বাসায়, বন্ধু-বান্ধবদের বলেছি অনেক কিছু খেয়েছি! পরিবার, বন্ধু-বান্ধবদের ঈদের আনন্দ মাটি করতে চাইনি বলেই মিথ্যা বলেছি!
বাংলাদেশের ঈদের দিন সকালে সবাই যখন ঈদের নামাজ শেষে কোরবানীর গরু নিয়ে ব্যস্ত তখন সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে দেখি দ্বিতীয় দিনও আশপাশের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ! তাই বাধ্য হয়ে না খেয়েই অফিসে যেতে হয়েছে। দুপুরে পাকিস্তানী সহকর্মী ডাল-সবজি, রুটি এনেছে অনেক দূরের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে। তাই খেয়েছি।
অফিস শেষে বিকেলে বাসায় আসার সময় অন্য দিনগুলোর মতই প্রবাসীদের কাজে ব্যস্ত দেখেছি। কেউ ময়লা উঠিয়ে ড্রামে ফেলছে, কেউ ট্যাক্সি চালাচ্ছে, কেউ দোকানদারি করছে। এই যে এত কষ্ট কাদের জন্য? দেশের জন্যই ত। কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ, মিডিয়া, কবি, নাট্যকার, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কষ্টের মূল্যায়ন কি আদৌ করে?
টিভিতে প্রবাস ফেরত চরিত্রগুলোকে এমনভাবে দেখানো হয় যে কারোই মনে হবে প্রবাসী মানেই ক্ষ্যাত, আনকালচারড, জোকার, ব্যাক্তিত্বহীন মানুষ ! 'ফকিরনির পোলারা বিদেশ যায়' এমন ডায়লগও বাংলা নাটকে দেওয়া হয়েছে ! ঢাকা বিমানবন্দরে একজন ইমিগ্রেশন অফিসার একজন প্রবাসীকে দেওয়া 'খানকির পোলা' গালি নিজ কানে শুনেছি! বাংলাদেশ বিমানের অনেক বিমানবালা এমন আচরণ করে মনে হয় উনারা মহারানী আর প্রবাসী প্যাসেঞ্জাররা উনাদের দাস! দেশে যাওয়ার আনন্দে প্রবাসীরা এইসব অপমান বুঝেও না বুঝার ভান করে। প্রতিবাদ করেনা পরিবারের মানুষগুলোর কথা ভেবেই। কারণ,প্রতিবাদ করলে উল্টো জেলে যেতে হবে। বড় অফিসারের কথা না শুনে প্রবাসী কামলাদের অভিযোগ শোনার মত রাষ্ট্র বাংলাদেশ এখনো হতে পারেনি।
অপমানই প্রবাসীদের নিয়তি এটা অনেক আগেই মেনে নিয়েছি। তাই কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক -এতগুণে গুণান্নিত আবু হাসান শাহরিয়ারের এমন অসভ্য আক্রমণের পরও কিছুই লিখিনি। না, প্রতিবাদ করতে নয়, উনার কাছে ক্ষমা চাইতেই এই লেখাটি।
জ্বী স্যার আবু হাসান শাহরিয়ার, জুতা পালিশ করা প্রবাসী কামলাদের একজন হয়ে আপনাকে সরি বলছি। কেন জানেন? কারণ, অনেকে আপনার আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে আপনাকে গালি দিয়েছে। এটা মোটেই ঠিক হয়নি। প্রবাসীদের প্রতি আপনার আক্রমণে আমি লজ্জিত না। কারণ, চাটুকারিতা করে নয়, পরিশ্রম করেই উপার্জন করি। বাংলাদেশের অর্থনীতির সচল কারিগর প্রবাসীদের আপনি নীচু,অপমানজনক মন্তব্য করতেই পারেন। কিন্তু, আপনার মত নীচু পর্যায়ে নামা প্রবাসীদের মোটেই উচিত হয়নি! এতে তাই আপনার কাছে আন্তরিক ভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি!

ফেসবুক - অযসবফধৎরভ২০১১