শনিবার, ১৬-ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন

মায়ানমারে পরিকল্পিত রোহিঙ্গা নির্মূল প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর, ২০১৭ ০৬:৫২ অপরাহ্ন

ফিরোজ মাহবুব কামাল: রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের জেনোসাইড বা গণহত্যাটি কোন সাম্প্রতিক নৃশংসতা নয়। সুপরিকল্পিত এক ব্লু-প্রিন্টের অংশ হিসেবে সেটি চলছে তিন দশকের বেশী কাল ধরে। সম্প্রতি সেটি পৌঁছেছে তার চুড়ান্ত পর্যায়ে। বিশ্বের  শক্তিবর্গ দেশগুলো এ ঘৃন্যতম জেনোসাইডকে বন্ধ করা দুরে থাক, নিন্দা করতেও ব্যর্থ হয়েছে। যা স্পষ্ট হয়ে গেছে গত ২৮ই সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে। ঐ বৈঠকটি মায়ানমারের বিরুদ্ধে কোনরূপ সিদ্ধান্ত ও নিন্দা প্রস্তাব ছাড়াই শেষ হয়। উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা ও তাদের নির্মূলের জন্য রাশিয়ার প্রতিনিধি মায়ানমারের সেনা চৌকির উপর রোহিঙ্গা আরাকান সালভেশন আর্মির হামলাকে দায়ী করে সমর্থন করেছে মায়ানমার সরকারের সকল নৃশংসতাকে। একইভাবে এই হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলাকে সমর্থন জানিয়েছে চীন, জাপান ও ভারত। বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তিগুলি যে কতটা হৃদয়হীন ও নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত, ঘটে যাওয়া ঘটনা তারই বড় প্রমাণ।
বিভিন্ন দেশে মুসলিম নির্যাতন
প্রেসিডেন্ট পুটিনের হাত রক্তাক্ত চেচেন ও দাগিস্তানী মুসলিমদের রক্তে। আশির দশকে আফগানিস্তান এবং ১৯৯৯-২০০০ সালে চেচনিয়ায় প্রচ- ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর রাশিয়ার যুদ্ধ বিমানগুলি এখন হত্যা ও ধ্বংস-যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার শহরগুলিতে। অপরদিকে চীন নিষ্ঠুর বর্বরতা চালাচ্ছে তার জিনজিয়াংয়ের উইগুর মুসলিমদের উপর। তাদের মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, ইবাদত-বন্দেগী ও কোরআন শিক্ষার ওপরও চাপানো হয়েছে কঠোর বিধি-নিষেধ। বিগত ৭০ বছর যাবৎ কাশ্মীরে চলছে ভারতীয় সেনাদের জুলুম, হত্যা, ধর্ষণ ও ভয়াবহ নির্যাতন। যে কোন অপরাধকে নিন্দা করার জন্য অপরিহার্য হলো নৈতিক বল। যা সবার থাকে না। প্রশ্ন হলো, নিজ দেশে যারা মুসলিম-হত্যা ও নির্যাতনের সাথে জড়িত, তারা কি অন্যদেশের-বিশেষ করে মায়ানমার সরকারের জেনোসাইডকে নিন্দা করার নৈতিক শক্তি রাখে? সম্প্রতি বৃহৎ শক্তিবর্গের নৈতিক বলের সে শূণ্যতাটিই প্রকটভাবে ধরা পড়লো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে।  
রোহিঙ্গা জনসংখ্যা হ্রাস
রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান কয়েক দশকের নৃশংস নিষ্ঠুরতায় তাদের জনসংখ্য অনেক কমে গেছে। ১৯৫২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ। (সূত্রঃ জেনোসাইড ইন মায়ানমার, লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গবেষণা।) ১৯৫২ সাল থেকে ২০১৭ সাল এ দীর্ঘ ৬৫ বছরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশের জনসংখ্যা তিন থেকে চার গুণ বৃদ্ধি পেলেও-  অবাক ব্যাপার হচ্ছে বিগত ৬৫ বছরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা বাড়েনি, বরং আশংকাজনকভাবে কমছে। ২০১৭ সালে এসে এখন বলা হচ্ছে তাদের সংখ্যা ১.১ মিলিয়ন তথা ১১লাখ। তাদের বিরুদ্ধে সরকার পরিচালিত নির্মূল প্রক্রিয়া যে কতটা সফল এ হলো তারই দলিল। হিসাবে অনুযায়ী এতোদিন রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিশ্চিত ৩৬ লাখে পৌঁছাতো। মুসলিম সংগরিষ্ঠ আরাকান বা রাখাইন আজ বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই এখন বৌদ্ধ। তবে নির্মূল-কর্ম এখন যেরূপ গতি পেয়েছে তাতে অচিরেই একটি আরাকান মুসলিম-শূণ্য এলাকায় পরিণত হবে। রোহিঙ্গা নির্মূল প্রক্রিয়াটি যে শধু গণহত্যার মাধ্যমে চলছে তা নয়। সেটি চলছে আরো কয়েকটি পদ্ধতিতে।
নব্য জেনোসাইডের স্তর সমুহ
রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যাতে না বাড়ে সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপানো হয়েছে বিবাহের উপর নিয়ন্ত্রণ। বিবাহিতদের বাধ্য করা হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে। রোহিঙ্গাদের দু’টির অধিক শিশু জন্ম দেয়াকে রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ বলা হচ্ছে। সে সাথে বাধ্য করা হচ্ছে দেশত্যাগে। সুদুর সৌদি আরবেই বসবাস করছে দেড় লাখ রোহিঙ্গা। তারা সেখানে গিয়েছিল ষাটের দশকে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাস এখন মালয়েশিয়ায়। জন্মহার কমানোর সাথে মায়ানমার সরকারের লক্ষ্য হলো মৃত্যুহার বাড়ানো। তাই রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষদের বঞ্চিত করা হচ্ছে চিকিৎসাসেবা থেকে। মায়ানমারের কোন হাসপাতালে তাদের প্রবেশাধিকার নাই। ফলে তাদের মাঝে মৃত্যুর হার, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর হার, মায়ানমারের অন্যান্য এলাকা থেকে অধিক। হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখার পাশাপাশি তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে শিক্ষা থেকেও। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দূরে থাক, রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বঞ্চিত হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকেও। লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, আরাকানে মুসলিম নির্মূলকরণ প্রকল্প যেভাবে এ অবধি কার্যকর করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে এটিই হলো জেনাসাইডের সনাতন পদ্ধতি। ৫টি স্তর পাড়ি দিয়ে মায়ানমারে সেটি পৌঁছেছে এখন সর্বশেষ স্তরে।
প্রথম স্তর: স্টিগমাটাইজেশন
যে কোন দেশে জেনোসাইড বা গণনির্মূলকরণ প্রকল্পের এটিই হলো প্রথম ধাপ। এ স্তরটিতে টার্গেট জনগোষ্ঠিকে নানাভাবে ডি-হিউম্যানাইজড ও দেশের সকল ব্যর্থতার জন্য বলির পাঠা বানানো হয়। যেমন জার্মানীর সকল পরাজয় ও ব্যর্থতার জন্য হিটলার ইহুদীদের দায়ী করতো। একই অবস্থা মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসিলমদের। তাদের গায়ে ইচ্ছামত সর্বপ্রকার অপবাদ লেপন করা হচ্ছে। তাদেরকে চিত্রিত করা হচ্ছে কালো, কালার, কুৎসিত ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি হিসেবে। অতীতে জার্মান থেকে ইহুদী, আমেরিকা থেকে রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাবঅরিজিন এবং বসনিয়া থেকে মুসলিমদের নির্মূলের লক্ষ্যে তাদেরকেও এরূপ মানবেতর এক ঘৃণীত জীব রূপে চিত্রিত করা হয়েছিল। ডি-হিউম্যানাইজেশনের এ স্তরটি অতিক্রান্ত হলেই রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, দেশের পুলিশ, সেনাসদস্য, সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের বিচারকগণও তখন নিজ নিজ ক্ষমতা নিয়ে নির্মূলের কাজে লেগে যায়। ১৯৭১ সালে তেমন একটি জঘন্য প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশে বসবাসকারি কয়েক লক্ষ অবাঙালী নারী, পুরুষ ও শিশু। ফলে অবাঙালী হত্যা, অবাঙালী নারী ধর্ষণ এবং তাদেরকে নিজ নিজ ঘর থেকে উৎখাত করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে কোন রূপ প্রতিবাদ উঠেনি। গণহত্যার নায়কগণ প্রতিদেশেই এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে বিবেকের মৃত্যু ঘটায়। বাংলাদেশে তেমন একটি প্রক্রিয়া এখনও সুপরিকল্পিতভাবে চলছে তাদের বিরুদ্ধে যারা একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সেটি গভীর হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে আরো কঠোরতর করতে বাধ্য হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণও। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে এ হলো ভারত ও ভারতীয় অর্থে প্রতিপালিত ইসলামের শত্রুপক্ষের অতি সুপরিচিত কৌশল। মায়ানমারে তেমন একটি নির্মূলমুখি পদ্ধতির শিকার হলো রোহিঙ্গা মুসলিমগণ।
দ্বিতীয় স্তর: হয়রানি,সহিংসতা ও সন্ত্রাস
যখন কোন সরকার একটি জনগোষ্ঠির নির্মূল চায়, তাদের বিরুদ্ধে নিজেদের কর্মকে শুধু ঘৃণা সৃষ্টির মধ্যে সীমিত রাখে না। সেগুলি আরো সহিংস ও আরো বর্বরতর করে। তখন রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, সরকারি প্রতিষ্ঠান সমুহ  ও সরকারি কর্মচারিগণ পরিণত হয় তাদের বিরুদ্ধে নানারূপ হয়রানি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের হাতিয়ারে। তখন সরকারেরর সহয়তায় সে জনগোষ্ঠির নির্মূলের দাবি নিয়ে শহরে শহরে নির্মূল কমিটি গড়ে উঠে এবং তারা নির্মূলে সহিংস পথেও নামে, যেমনটি একাত্তরে বাংলাদেশে বিহারীদের বিরুদ্ধে নেমেছিল একটি বড় জনগোষ্ঠি। মায়ানমারে আজ যে বার্মীজ জাতীয়তাবাদীগণ রোহিঙ্গাদের নির্মূলে নেমেছে তাদের জন্ম ও বেড়ে উঠাটিও মূলত বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের ন্যায় একই রূপ সহিংস চেতনা নিয়ে। ফলে তারা আদর্শিক সহোদর হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের। একারণেই বার্মীজ সরকার যখন রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলি একের পর জ্বালিয়ে দিতে ব্যস্ত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সেটি নিন্দনীয় গণ্য হয়নি। তিনি সেটিকে নিন্দা করে কোন বিবৃতিও দেননি। বরং নিজের খাদ্যমন্ত্রীকে মায়ানমারে পাঠিয়েছিলেন সেখান থেকে চাউল কিনতে। এবং মায়ানমার সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষ থেকে কোন সশস্ত্র লড়াই শুরু হলে ব্ংালাদেশের সেনাবাহিনী সেদেশের সরকারের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে লড়বে। মায়ানমার সরকারের এরূপ মুসলিম-নির্মূল নীতির প্রতি গভীর আশির্বাদ রয়েছে ভারত সরকারেরও। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে একজন প্রথম সারির সন্ত্রাসী। তার হাতে রয়েছে গুজরাটের মুসলিমদের রক্ত। মুসলিমদের রক্ত নিয়ে উল্লাস করাই তার রাজনীতি ও সংস্কৃতি। তিনি আরাকানের মুসলিম উচ্ছেদের স্বপ্নদ্রষ্টাও বটে। এজন্য তাকে তড়িঘড়ি ঘটনার মধ্যেই ছুটে যেতে দেখা গেছে মায়ানমারে। সেখানে গিয়ে তিনি ঘোষণা দেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সকল নির্মূল কর্মে ভারত সরকার মায়ানমার সরকারের পাশে থাকবে। সম্প্রতি প্রচ- মুসলিম-বিদ্বেষী ভারতীয় সংগঠন আর. এস. এস.য়ের নেতাগণও মায়ানমারে ছুটেছিল সে একই কথা জানাতে।  
মায়ানমারে রোহিঙ্গা-নির্মূলকামী সংগঠনগুলোর সংখ্যা অনেক। তবে তাদের মধ্যে প্রধান হলো ‘মা বা থা’ এবং ‘৯৬৯ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’। রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলা হোক -তাতেও এসব সংগঠনের প্রচ-  আপত্তি। তাদের দাবি, রোহিঙ্গা বলে মায়ানমারে কোন জনগোষ্ঠি নাই। যারা আছে তারা হলো বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালী। অতএব দাবী, তাদের একমাত্র বাঙালীই বলতে হবে এবং বাংলাদেশেই তাদের ফিরে যেতে হবে। যেমন বাংলাদেশের নির্মূল কমিটির দাবি, সকল অবাঙালীদের পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন যখন তার বক্তৃতায় রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেও এরা বিক্ষোভ করেছিল। রোহিঙ্গাদের এ ভয়াবহ বিপদকালে তারা জাতিসংঘের ত্রাণসামগ্রীও রোহিঙ্গা গ্রামে পৌঁছতে বাধা দিয়েছে। বিদেশী কোন সাংবাদিককে ঢুকতেও দেয়নি তারা। রোহিঙ্গা সমাস্যার সমাধান খুঁজতে জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনান যখন মায়ানমারে যান, তাঁর বিরুদ্ধেও তারা মিছিল করেছিল। মায়ানমারে ১৩০টির বেশী জাতিসত্তা আছে। কিন্তু শুধুমাত্র স্বীকৃতি নাই রোহিঙ্গাদের। শত শত বছর সে দেশে বসবাস করলে কি হবে, আইন করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। তারা চিত্রিত হয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি রূপে। তাদের দাবী, এ অবৈধদের থেকে তাদের বসত ভিটা, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি-জমা, চাকুরি-বাকুরি  ছিনিয়ে নেয়া হোক। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কার্যকরও করা হয়েছে।
তৃতীয় স্তর: আইসোলেশন ও পৃথকীকরণ
জাতিগত নির্মূলের এ হলো তৃতীয় পর্যায়। যতদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল বা দেশত্যাগে বাধ্য করার সুযোগ সৃষ্টি না করা যায়, ততদিন পর্যন্ত তাদের পলিসি হলো, চিহ্নিত জনগোষ্ঠিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি থেকে পৃথক করা। হিটলার সে লক্ষ্যেই ইহুদীর জন্য গড়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। গ্যাস চেম্বারে নিয়ে হত্যা করার পূর্ব পর্যন্ত সে ক্যাম্পগুলোর নানা রূপ কষ্ট, অপুষ্টি ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে একই নীতির প্রয়োগ করা হয় অবাঙালীদেরকে বিরুদ্ধে। তাদেরকে নিজ নিজ ঘর-বাড়ী থেকে উঠিয়ে মহম্মদপুরের জেনেভা কাম্পের ন্যায় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়। তেমনি মিয়ানমারেও রোহিঙ্গাদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বহু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। এরূপ নতুন নতুন ক্যাম্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে অথবা বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার জন্য কয়েক বছর পর পরই রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সেসব ক্যাম্প ঘিরে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর ফাঁড়ি বসানো হয়। যাতে সে ক্যাম্পের বন্দিদশা থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বাইরে আসতে না পারে বা কোথাও গিয়ে আবার যেন কোন আবাদী গড়ে না তুলে। এরূপ আইসোলেশন বা পৃথকীকরণ হলো মানুষকে শক্তিহীন করার সফল প্রক্রিয়া। সংঘবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার মধ্যেই একটি জনগোষ্ঠির শক্তি। আইসোলেশন বা পৃথককরণের মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠির পারস্পারিক সংযোগ বিলীন করা হয়। এভাবে তাদের দুর্বল করা হয়। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শের অঙ্গন থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক বিচ্ছন্ন করা হয়। এ কারণে বস্তুবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমগণ আজ নেতাশূণ্য ও সংগঠনশূণ্য। কোন মুসলিম সমাজে সংঘবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতা গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো মসজিদ। এটিই ইসলামের সনাতন সামাজিক ইন্সটিটিউশন। জমিনের উপর এটিই মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিষ্ঠান। সেটি ইসলাম ও মুসলিমের শত্রুদের অজানা নয়। ফলে প্রতিদেশেই ইসলামের শত্রুপক্ষ শুধু রাষ্ট্রের দখলদারিই হাতে নেয় না,  দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে এবং পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে সেসব দেশের মসজিদগুলিও। রাশিয়া ও চীনে তাই হাজার হাজার মসজিদকে কম্যুনিষ্টগণ আস্তাবল বানিয়েছিল। একইভাবে মায়ানমারে শতশত মসজিদকে ধ্বংস করা হয়েছে, অথবা সেগুলির দরজায় তালা লাগানো হয়েছে। মুসলিম নির্মূলকামী ‘মা বা থা’ এবং ‘৯৬৯ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’এর নেতাগণ মসজিদকে বলে মুসলিমদের দুর্গ। তাই মসজিদকে তারা যেমন নিজেরা ধ্বংস করে, তেমনি সরকারেরর কাছেও দাবী করে সেগুলো দ্রুত বন্ধ করে দেয়ার। কোন চায়ের দোকানে বেশী মুসলিম জড়ো হলে তদন্ত শুরু হয়, সেটি মসজিদ কিনা।
চতুর্থ স্তর: পরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমীক দুর্বলীকরণ
রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল করণে যে রোডম্যাপটি হুবহু অনুসরণ করা হচ্ছে তার একটি নৃশংস পর্যায় হলো, টার্গেট করে ক্রমান্বয়ে তাদেরকে দৈহিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দুর্বল ও নির্জীব করা। এজন্য তারা যেমন তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঠাসাঠাসী করে জড়ো করে, তেমনি ক্যাম্পে রেখে তাদেরকে আলো-বাতাস, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্মকর্ম, রাজনীতি, সমাজকর্ম ও পরস্পরে মেলামেশার ন্যায় অপরিহার্য বিষয়গুলো থেকেও বঞ্চিত করে। সে সাথে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় লাগাতর অপমান, অবমাননা ও নির্যাতন। পরিকল্পিত ভাবে অপুষ্টি, মহামারি ও চিকিৎসাহীনতা তাদের জন্য নিত্য সহচর করা হয়। যেসব রোহিঙ্গাগণ এক সময় স্বচ্ছল গৃহস্থ্য, চাকুরিজীবী বা ব্যবসায়ী ছিল, তাদের ঘর-বাড়ি, দোকান-পাঠ ও চাকুরি-বাকুড়ি কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব বস্তিবাসী করা হয়েছে। যারা এক সময় মসজিদের ইমাম, স্কুল-কলেজের শিক্ষক বা রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল তারা এখন নিঃস্ব বস্তিবাসী। তাদের যেমন শহরে প্রবেশাধিকার নেই, তেমনি নেই হাট-বাজার, হাসপাতাল, বিদ্যালয়ে প্রবেশের অধিকার। অধিকার নেই মসজিদে যাওয়ার। বস্তির ঘরের আলো-বাতাসহীন স্যাঁত-সেঁতে মেঝেতে রোগাগ্রস্ত দুর্বল দেহ নিয়ে রাত-দিন শুয়ে থাকা ও ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্প পথ খোলা রাখা হয়নি। চাকু চালিয়ে জবাই করা বা বন্দুকের গুলিতে হত্যাই কেবলমাত্র গণহত্যা নয়। গণহত্যার আরেক নৃশংস রূপ হলো এভাবে মৃত্যুর দিকে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া।
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম