শনিবার, ১৬-ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রশাসনে পদোন্নতি ও ডিসি পদায়নে ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট’ আতংক

প্রশাসনে পদোন্নতি ও ডিসি পদায়নে ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট’ আতংক

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০৭:১৬ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: জনপ্রশাসনে এক সময় পদোন্নতি হতো জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে। বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা এ ধরনের গুরুতর কোনও সমস্যা না থাকলে জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী সবাই পদোন্নতি পেতেন। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এতে অনেক মেধাবী, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তার পদোন্নতির স্বপ্ন ধুলিস্মাৎ হয়ে যাচ্ছে। এ স্বপ্ন ধরার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে পেছনে ঘুরতে হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তাদেরকে। তাতেও সফল হচ্ছেন না। এতে সৎ, মেধাবী, নিরীহ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
সূত্রমতে, বর্তমানে প্রশাসনে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট’ একটি বড় আতংক হিসেবে দেখা দিয়েছে। কোন্ গোয়েন্দা সংস্থা কি রিপোর্ট দিচ্ছে- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তা জানতেও পারছেন না। পরবর্তীতে এ রিপোর্টের উপর তার বক্তব্য নেয়া হচ্ছে না। ফলে তার আত্মপক্ষ সমর্থনেরও কোনও সুযোগ থাকছে না। আর এ কারণে তথাকথিত ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট’কে কেন্দ্র করে প্রশাসনে ইতিমধ্যে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এতে ব্যক্তিগত রেষারেষি হাসিল হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছামাফিক’ গোয়েন্দা রিপোর্ট তৈরি করে আনা হচ্ছে। সেই গোয়েন্দা রিপোর্টের দোহাই দিয়ে যোগ্য কর্মকর্তাকে পদোন্নতি-পদায়ন বঞ্চিত করা হচ্ছে। এমনকি সরকার সমর্থক কর্মকর্তারাও কেউ কেউ এমন অন্যায়-অবিচারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, কারো সম্পর্কে কোনও গোয়েন্দা রিপোর্ট একবার খারাপ এলে তার জন্য আওয়ামী লীগেরই মন্ত্রী-এমপিরা সার্টিফিকেট দিয়ে তদবির করলেও পুনঃতদন্তের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। খতিয়ে দেখা হচ্ছে না, রিপোর্টটি সঠিক কিনা।
জনপ্রশাসনে আরেক দফায় পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে এখন। অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির তালিকা প্রায় চূড়ান্ত। যদিও এবার লেফট আউট বেশকিছু সংখ্যক কর্মকর্তা পদোন্নতি পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবুও তথাকথিত গোয়েন্দা রিপোর্টের অজুহাতে অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে এখন পর্যন্ত তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। জানা গেছে, এদের মধ্যে একজনের সম্পর্কে গোয়েন্দা রিপোর্টে নাকি বলা হয়েছে, তিনি ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। অথচ আদৌ এই কর্মকর্তা কখনও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেননি। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অন্য এক মহিলা কর্মকর্তা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি তার জেলার ‘ওমুক’ বিএনপি নেতার আত্মীয়। অথচ এই মহিলা কর্মকর্তা কখনও নিজ জেলায় বা গ্রামের এলাকায় যান না। তার বাবা ঢাকায় চাকরি করতেন। সেই সুবাদে তারা পুরো পরিবার দীর্ঘকাল থেকে ঢাকারই স্থায়ী বাসিন্দা। এমনকি তার পরিবারের কেউ বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টই নয়। বরং তার আপন ভাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাচিপের কেন্দ্রীয় নেতা। এ তথ্যগুলো গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ না করে, গ্রামের কোন্ আত্মীয় বিএনপি নেতা সেটি রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে, যে আত্মীয়ের সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ বা সম্পর্কই আদতে নেই।
শুধু পদোন্নতিই নয়, সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদায়নেও এমন অদৃশ্য ছুরি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ডিসি পদায়নে এ গোয়েন্দা রিপোর্ট মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেককে বাদ দেয়া হয়েছে এ ধরনের ‘ভুয়া’ গোয়েন্দা রিপোর্টের দোহাই দিয়ে। জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের জন্য প্রশাসনের ১৫তম, ১৭তম এবং ১৮তম ব্যাচকে পদায়ন করা হচ্ছিল। ফিট লিস্টের পরে এদের ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল স্ত্রী বা স্বামীসহ। তাদের মধ্য থেকে অধিকাংশকে পদায়নও করা হয়েছে ইতিমধ্যে। ডিসি পদে ট্রেনিং নেওয়া এই তিনটি ব্যাচের চারজন কর্মকর্তা পদায়নের বাকি আছে। কিন্তু এদের পদায়ন না করে পরবর্তী অর্থাৎ ২০তম ব্যাচ থেকে পদায়নের তোড়জোড় চলছে এখন। সাভারে ট্রেনিং করে এসেছে ২০তম ব্যাচ। শিগগিরই এদের পদায়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগের ব্যাচের এই কয়েকজন কর্মকর্তাকে ডিসি পদায়ন থেকে বাদ রাখা হয়েছে কিছু খোঁড়া যুক্তিতে। একজন মহিলা কর্মকর্তাকে ডিসি পদায়ন থেকে বাদ রাখা হয়েছে তার বাবা এক সময় এমপি লিটন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করেছেন এই অজুহাতে। আরেকজন কর্মকর্তাকে বাদ দেয়া হয়েছে এক গোয়েন্দা রিপোর্টের কথা বলে। এই কর্মকর্তার নাম সরদার মো. কেরামত আলী। তিনি বর্তমানে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর-এর পিএস পদে আছেন। আসাদুজ্জামান নূর তার পিএস সরদার মো. কেরামত আলীকে ডিসি পদে পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বরাবর ডিও লেটার লিখেছেন। ওই ডিও লেটারে সংস্কৃতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, “আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, সরদার মো. কেরামত আলী, উপসচিব (পরিচিতি নং ৬২৮৯), ১৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। তিনি বর্তমানে আমার একান্ত সচিব হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করলে সরকারের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নসহ জনকল্যাণমূলক সকল কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। উল্লেখ্য,  তিনি ফিট লিস্টভুক্ত একজন কর্মকর্তা এবং ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
০২। বর্ণিত অবস্থায়, আমার একান্ত সচিব জনাব সরদার মো. কেরামত আলী কে জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নের জন্য আপনার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ডিও লেটারটি লিখেন গত ২৬ জুলাই। এই ডিও লেটারের উপর জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম “পদায়নের জন্য উপস্থাপন করুন” লিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠান।  
এছাড়া গত ৩ আগস্ট, ২০১৭ বাগেরহাট-২ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি মীর শওকাত আলী বাদশাও উপসচিব সরদার মো. কেরামত আলীর জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বরাবর একটি ডিও লেটার লিখেন। তিনি লিখেন,
“আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, সরদার মো. কেরামত আলী, উপসচিব (পরিচিতি নং ৬২৮৯), ১৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। বর্তমানে মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত। তিনি আমার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এবং আওয়ামী লীগ পরিবারের একজন সদস্য। তার শ্বশুরও একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নের জন্য তিনি ফিট লিস্টভুক্ত হয়েছেন এবং ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। একজন দক্ষ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে তাকে জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন করলে সরকারের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নসহ জনকল্যাণমূলক সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।
বর্ণিত অবস্থায় আমার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা বর্তমান মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব জনাব সরদার মো. কেরামত আলীকে জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নের জন্য আপনার ব্যক্তিগত সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
কিন্তু এতো কিছুর পরও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান উপসচিব সরদার কেরামত আলীকে ডিসি পদে পদায়ন দিতে পারেননি তথাকথিত এক গোয়েন্দা রিপোর্টের কারণে। সরকারের একটি সংস্থার গোয়েন্দা রিপোর্টে বিরূপ মন্তব্য থাকা সম্পর্কে জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থাটির মাঠ পর্যায়ের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সরদার কেরামত আলীর ইতিপূর্বে এক সময় বিরোধ হয়েছিল সরকারি আবাসন পরিদফতরের একটি বাসা বরাদ্দকে কেন্দ্র করে। আর সেই প্রতিশোধই তিনি কেরামত আলীর উপর নিয়েছেন তদন্ত রিপোর্টে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিরূপ মন্তব্য তুলে ধরার মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ডিও লেটার, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নির্দেশনা এবং আওয়ামী লীগের এমপি মীর শওকাত আলী বাদশার ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান উপসচিব সরদার কেরামত আলীর বিষয়ে পুনরায় গোয়েন্দা রিপোর্ট নেয়ার জন্য লিখেছিলেন। কিন্তু, সেটিও এখন আটকে আছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর প্রকাশিত)