রবিবার, ১৭-ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পরিচালকের নেতৃত্বে কোটি কোটি টাকা লুটপাট

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পরিচালকের নেতৃত্বে কোটি কোটি টাকা লুটপাট

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ জুলাই, ২০১৭ ০৯:১১ পূর্বাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে ডা. আনিসুর রহমান এসেছেন গত ১ জুন। এসেই তিনি ব্যাপক লুটপাটে জড়িয়ে পড়েছেন। সরকারের কোন নিয়ম-নীতির ধার ধারছেন না। ক্রয় আইন চরমভাবে লঙ্ঘন করছেন। কোন টেন্ডার-কোটেশন ছাড়াই প্রায় এক সপ্তায় নগদ ক্রয়সহ বিভিন্ন বাবদ খরচ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। যা তিনি পারেন না। মালামাল ক্রয় বা যথাযথ খাতে খরচ না করেই এই অর্থের অধিকাংশ তিনি আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।   
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রজীবনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে থাকাকালে ডা আনিসুর রহমান ছিলেন ছাত্রশিবিরের সক্রিয় সদস্য। গ্রামের বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জে। চাকরিজীবনে ঢুকেই কিছুদিনের মাথায় বিএনপি সমর্থিত সংগঠন ড্যাবের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মেডিকেল অফিসার পদে থাকাকালে শীর্ষস্থানীয় ড্যাব নেতাদের সহযোগিতায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন। একনাগাড়ে দীর্ঘ নয় বছর সৌদি আরব থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী এক নাগাড়ে পাঁচ বছরের বেশি চাকরির বাইরে থাকার সুযোগ নেই। অথচ নয় বছর পরে এলেও ডা. আনিসুর রহমান চাকরিতে বহাল হন, এমনকি এর সঙ্গে পদোন্নতিও বাগিয়ে নেন। এক পর্যায়ে আনিসুর রহমানের পদায়ন হয়েছিল ‘এইচআইভি এইডস এন্ড এসটিডি’র লাইন ডাইরেক্টর হিসেবে। তিনি লাইন ডাইরেক্টর পদে থাকাকালে এই প্রকল্পের কাজকর্মের মূল নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এর অধীনে চলে যায়। দুর্নীতির সুযোগ কমে যাওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। তদবির করে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন। এতে তার বড় অংকের অর্থও খরচ হয় বলে খবর প্রচারিত আছে।
গত ১ জুন ডা. আনিসুর রহমান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকের পদে বসেই ঘুষবাবদ যে অর্থ খরচ করেছিলেন তা তোলার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে হাতে নেন। আর শুরু করেন বেপরোয়া দুর্নীতি। অর্থবছরের শেষ সময়। আর এই সুযোগটি কাজে লাগান। প্রায় এক সপ্তায় তিনি ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার কেনাকাটাসহ বিভিন্ন বাবদ খরচ দেখান। এরজন্য কোন টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। এমনকি কোন কোটেশনও করা হয়নি। পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান যুগ্মসচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা মাত্র। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী এই পর্যায়ের কোন কর্মকর্তা জরুরি প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত একবারে খরচ করতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে মোট খরচ বছরে কোন ক্রমেই ৫ লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না। অথচ, আনিসুর রহমান মাত্র এক সপ্তায়ই ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা নগদ খরচ দেখান। যা তিনি কোনভাবেই পারেন না। এরমধ্যে কর্মচারীদের পোশাক ক্রয় বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যন্ত্রপাতি মেরামত খাতে ৩৫ লাখ টাকা, কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয় বাবদ ২৮ লাখ টাকা, বইপুস্তক ক্রয় খাতে ১২ লাখ টাকা, আসবাবপত্র ক্রয় খাতে ১৭ লাখ টাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে ৭ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়। এছাড়া কম্পিউটার, মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়। আলাদা আলাদা ভাউচারে ২৫ হাজার টাকা করে এই অর্থ খরচ দেখানো হয়। সরকারের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যয়খাতের কোড ভেঙে খুচরো খরচ করার সুযোগ নেই। টেন্ডার বা প্রতিযোগিতামূলক দর যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা যাতে এড়াতে না পারে সেজন্যই ক্রয় আইনে এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। অথচ ডা. আনিসুর রহমান ক্রয় আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মোট ব্যয়ের কোড ভেঙে মনগড়াভাবে ভাউচারের মাধ্যমে খুচরো খরচ দেখিয়েছেন। বস্তুত তিনি এই বিপুল অর্থের অধিকাংশই আত্মসাত করেছেন।
জানা গেছে, পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান লুটপাটের সুবিধার জন্য শুরুতেই দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেটকে হাতে নেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন হিসাবরক্ষক মাহবুবুর রহমান, যিনি একই স্থানে একই পদে প্রায় ২৪ বছর ধরে আছেন। নানা কারণেই এই মাহবুবুর রহমান অত্যন্ত বিতর্কিত। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে যখন যিনি পরিচালক পদে আসেন তাকেই মাহবুবুর রহমান তার সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। হিসাব রক্ষক মাহবুবুর রহমান একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। অথচ এই তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর অফিস কক্ষ পরিদর্শন করে দেখা যায় যে, দামি স্প্লিট এসি, ফ্রিজসহ বিলাসবহুল আসবাবপত্র ব্যবহার করছেন তিনি। দিনে-রাতে এখানে নানা রকমের আড্ডা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মাহবুবুর রহমান ইতিপূর্বে দুর্নীতির দায়ে এখান থেকে বক্ষব্যাধী হাসপাতালে বদলি হলেও মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে সেই বদলির আদেশ বাতিলের ব্যবস্থা করেন। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কম্পাউন্ডে ওষুধ প্রশাসনের ভবন নির্মাণের জন্য যে জমি বরাদ্দ আছে তা দখল করে মাহবুবুর রহমান একতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। নিজে বসবাস করা ছাড়াও এখানকার ১০টি ঘর ভাড়া দিয়ে তিনি মাসে প্রায় লাখ টাকা আয় করছেন অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে।
সূত্র জানায়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি কল্যাণ সমিতি আছে। মাহবুবুর রহমান এই সমিতির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি। পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান পদাধিকারবলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মালিকানাধীন এই সমিতির অর্থও ব্যাপকহারে লুটপাট চলছে। মাহবুবুর রহমানের সহযোগিতায় পরিচালক আনিসুর রহমান ভুয়া বিল-ভাউচারে সম্প্রতি এই সমিতির প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন। ইতিপূর্বে মাহবুবুর রহমান নিজেই ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারে আত্মসাত করেন।
পরিচালক ড. আনিসুর রহমান তার দুর্নীতির সহযোগী নয় এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে কোন কাজকর্ম না দিয়ে বসিয়ে রাখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমন একজন হলেন সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আলাউদ্দিন আল আজাদ। ডা. আজাদ সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন, সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন অথচ সরকারকে কোন সেবা দিতে পারছেন না। তাকে অঘোষিতভাবে ওএসডি রেখে তার কাজ উপপরিচালক (বিপিএল)কে দিয়ে করাচ্ছেন পরিচালক। একজনের কাজ আরেকজনকে দিয়ে করানোর ব্যাপারে কোন লিখিত অফিস আদেশও জারি করা হয়নি বলে জানা গেছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই  প্রকাশিত)