শনিবার, ১৯-আগস্ট ২০১৭, ০৭:৪০ পূর্বাহ্ন

‘দুর্নীতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’

প্রকাশ : ৩০ জুলাই, ২০১৭ ০৮:৪২ পূর্বাহ্ন

একরামুল হক: “বেতন বাড়িয়েছি, এবার সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে”- সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী কঠোর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন এই ‘দুর্নীতি’ ইস্যুটি বেশ আলোচনায়। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে লুটপাট, সুইস ব্যাংকে ও মালয়েশিয়ায় অর্থপাচার এবং মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় সেকেন্ড হোম প্রভৃতির খবর আসছে একের পর এক। যা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।
দেশের সুধীমহল মনে করছেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু, শুধুমাত্র দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহযোগিতা এতে অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য যদিও অনেক বিলম্বে এসেছে তারপরও সরকারি কর্মকা-ে কিছুটা হলেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং তাতে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে সহায়তা করবে, সুধীমহলের কেউ কেউ আশা করছেন। তবে এমন দৃষ্টিভঙ্গির সুফল পেতে হলে সরকারকে এ ব্যাপারে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে, সরকারি কর্মকা-ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তারা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, গত ২ জুলাই রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ বক্তব্যটি দেন। সচিবদের কাজের বিষয়ে নির্দেশনা দিতে ও পর্যালোচনা করতে এ বৈঠকটির আয়োজন করা হয়েছিল।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, দুর্নীতি দমন করা দুদকের একার কাজ নয়। সরকারে যারা থাকেন তাদের সহযোগিতা এতে অপরিহার্য। তিনি বলেন, এখন বেতন অনেক বেড়েছে। আমাদের সময়ে বেতন-ভাতা অনেক কম ছিল। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘২০০৮ সালে অবসরের সময় আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে যে বেতন পেতাম, এখন নতুন চাকরিতে ঢুকেই একজন বিসিএস অফিসার সেই বেতন পাচ্ছেন। স্বচ্ছল জীবন-যাপন করতে পারছেন। কাজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর হওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু এমন কথা বলেছেন এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে নিশ্চয়ই। তবে এরজন্য বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাবেক সচিব কারার মাহমুদুল হাসান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন; ইতিপূর্বে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন কম পেতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন-যাপন করা কষ্টকর ছিল। সরকারি কাজে মনোযোগ দিতে পারতো না। এখন বেতন তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে। সেই অনুযায়ী সরকারি কাজকর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। তিনি বলেন, যারা সরকারের নীতির বাস্তবায়ন করেন তাদের উদ্দেশ্যে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এমন বক্তব্য দিয়েছেন কাজেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সর্বশেষ, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আরেকটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। গত ১০ জুলাই অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বরকে জাতীয় পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন। এক সপ্তার ব্যবধানে এই দুটি পদক্ষেপকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন অনেকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি ইতিমধ্যে এক বিবৃতিতে সরকারের এমন পদক্ষেপকে অভিনন্দন জানিয়েছে।   
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে যে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয় তাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন অনেক বাড়ানো হয়েছে। বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে যুক্তিটিকে বিবেচনায় আনা হয়েছিল তা হলো, বেতন-ভাতা বাড়লে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা কোন অংশেই কমেনি। বরং ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। দুর্নীতি দমন কমিশনও এ বিষয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে একাধিকবার।
দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়েছে, প্রশাসনসহ সরকারি সেক্টরে এখনো অনেক সৎ এবং নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা নিরলসভাবে সেবা দিতে চান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করতে চান। দেখা গেছে, কষ্টের মধ্য দিয়ে সংসার চললেও ঘুষ-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে রাজি নন তারা। কিন্তু, ঊর্ধ্বতন বস কিংবা রাজনৈতিক অথবা অন্য কোন প্রভাবে অনিয়ম করতে তারা বাধ্য হন। তা নাহলে শাস্তিমূলক বদলি, পদোন্নতি বঞ্চিতসহ নানাভাবে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি অনেকের পক্ষেই এড়ানো সম্ভব হয় না। ফলে এক পর্যায়ে এসে ¯্রােতে গা ভাসিয়ে দেন। এই কর্মকর্তারা কেউ কেউ নিজেরাও এক সময় দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
কারণ, তখন তাদের মধ্যে এমন প্রশ্ন দেখা দেয় যে, অন্যায়-অনিয়ম যেহেতু করতেই হচ্ছে তাহলে এর সুবিধা নিজেরা নেবেন না কেন? ক্রমান্বয়ে এদের মধ্যেও দুর্নীতির প্রবণতা সংক্রামিত হয়। তাছাড়া এটা সবাই জানেন, দুর্নীতি একটা সংক্রামিত রোগ। একজনের দেখাদেখি অন্যজনও দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয়। বিশেষ করে পারিবারিক চাপ একে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। আবার অনেকে চাকরির শেষ জীবনে এসেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, যখন তিনি দেখেন অন্যরা ইতিমধ্যে আখের গুছিয়ে ফেলেছে।
তাই এ বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই দুর্নীতিরোধে আন্তরিক হতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব বা অন্য কোন প্রভাব সরকারি কাজের নিয়ম-নীতিকে যাতে বাধাগ্রস্থ করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তবেই দুর্নীতিরোধের প্রচেষ্টায় সফলতা পাওয়া যাবে। সৎ ও নিষ্ঠাবানদের কাজকে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরষ্কার-তিরষ্কারের ব্যবস্থা উভয়ই থাকতে হবে। তাতে সরকারি দফতরে কর্মোদ্দীপনা বাড়বে।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জনগণের ট্যাক্সের অর্থ বা সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার করা যাচ্ছে না সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই। অর্থ অপচয় এবং আত্মসাত হচ্ছে ব্যাপকহারে। সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের উন্নয়নও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্থ করছে এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি।
সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ প্রকাশনার শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে আসছে। আমরা এই পর্যায়ে সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো, শুধু কথার কথা নয়, দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। এতে সরকার এবং দলের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল হবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই  প্রকাশিত)