বুধবার, ১৮-অক্টোবর ২০১৭, ০৫:০৮ অপরাহ্ন

খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর আলোচনার কেন্দ্রে

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট, ২০১৭ ০৮:১১ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: দেশের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর। তিনি লন্ডনে কী করছেন, কী কাজে নিয়োজিত আছেন, কখন দেশে ফিরে আসবেন, কোন বার্তা নিয়ে ফিরে আসবেন- এসব নিয়েই আলোচনা, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা চলছে। খালেদা জিয়া লন্ডন পৌঁছার পর থেকেই সরকারের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বা টেনশন কাজ করছে। সরকারের তরফে যেসব খবরাÑখবর আসছে তাতে তারা মনে করছেন, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া শিগগরিই দেশে ফিরছেন না। সবকিছু চূড়ান্ত করেই তিনি দেশে আসবেন। সেটা ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্তও লেগে যেতে পারে। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমানও দেশে ফিরতে পারেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। সেই পরিস্থিতিটা সরকারের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে দেখা দিতে পারে, এমন আশংকারও সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এখন বেশ পুলকিত। তাদের কথাবার্তায় এমনই মনে হচ্ছে। গলার স্বরও অনেক বেড়ে গেছে। ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, সামনে তাদের সুদিন আসছে। বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ফিরবেন সেই সুদিনের চূড়ান্ত বার্তা নিয়েই। ফলে যাদের টাকা-পয়সা আছেন এমন নেতারা কেউ কেউ লন্ডন পর্যন্তও ছুটছেন। উদ্দেশ্য, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের সান্নিধ্যে, সুনজরে আসা। কিন্তু যতটা খোঁজ-খবর পাওয়া যাচ্ছে, লন্ডন যাওয়ার উদ্দেশ্য তাদের সফল হচ্ছে না। বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান দলের নেতা-কর্মীদেরকে লন্ডনে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না। অনেকটা দূরে দূরেই থাকছেন তারা। আর এ কারণে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের কর্মকা- নিয়ে কৌতুহলও বাড়ছে।
বেগম খালেদা জিয়া গত জুলাই লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তার দু’দিন পরেই ১৭ জুলাইয়ের মন্ত্রিপরিষদ সভার অনির্ধারিত আলোচনায় বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের ইস্যুটি আসে। মন্ত্রিসভার একজন সদস্য এই বলে হঠাৎ মন্তব্য করেন, ‘সাজার ভয়ে খালেদা জিয়া দেশে আসবেন কিনা, কেউ জানে না। দেখেন দেশে আসবেন কিনা।’ এ আলোচনায় অন্য মন্ত্রীরাও অংশ নেন। আর সেই থেকেই নানা রকমের কথা দ্রুত ঢালপালা গজাতে থাকে।
তিনি লন্ডন গেছেন পা ও চোখের চিকিৎসা করাবেন বলে। ইতিপূর্বেও তিনি লন্ডনে চিকিৎসা করিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই লন্ডন যাত্রা। দলের পক্ষ থেকে এমনই সংবাদ প্রচার করা হয়েছে যদিও এবারের তার লন্ডন সফরকে কেউই স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না। সফরটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক সংকটের এখন একটা চূড়ান্ত পর্যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর সেই কারণেই খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর এতোটা আলোচনায়। অবশ্য, বিএনপির তরফ থেকে অফিসিয়ালি জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর সম্পর্কে সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপপ্রচার রটাচ্ছে। চিকিৎসা শেষে তিনি নির্ধারিত সময়েই দেশে ফিরে আসবেন।  
এটা সবাই বোঝেন, বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক বিদেশিরা। অতীতে তাই দেখা গেছে। মনে করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে বিদেশিদের প্রভাব আরো বাড়তে পারে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে বিদেশিদের কার কী ভূমিকা- এটা জানা বা বোঝা সরকারি দল-বিরোধীদল উভয়ের জন্যই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন বসে সেই কাজগুলো সম্পন্ন করছেন কিনা, এ আশংকা সরকারি দল এবং সরকারের মধ্যে দেখা দিয়েছে। বলা হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কূটনৈতিক মহল ছাড়াও বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা প্রধানদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করছেন, এমন অভিযোগও সরকারের তরফ থেকে করা হচ্ছে। গত ২৮ জুলাই এক বক্তৃতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া লন্ডনে ষড়যন্ত্র করছে কিনা সরকার খোঁজ নিচ্ছে।’ অন্যদিকে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরে সরকারের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।’
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, ২০০১ সালে বিএনপি ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় এসেছিল। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এমন কথা একাধিকবার বলেছেন। বস্তুত, ভেতরে ভেতরে সরকারি মহলে এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে যে, বিএনপি ২০০১ সালের মতো কিছু একটা করছে কিনা? বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন ভালো যাচ্ছে না। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গেও বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েন চলছে। আর সেই কারণেই সরকারি মহলে এ উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এর আগে অনেকবার লন্ডন সফরে গেছেন। কিন্তু, কখনো এ বিষয়টি নিয়ে এতো আলোচনা বা বিতর্ক দেখা দেয়নি। এবার কেন এটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। তারা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। তাই নানা রকমের কথা বলছেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশে ফিরেই নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবেন। রূপরেখা না মানলে আন্দোলন শুরু হবে।
এই নেতা আরো দাবি করেন, সরকার ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা খেলতে চাইছে। কিন্তু এবার তা আর হবে না। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হবে না।
বহুল আলোচিত সহায়ক সরকারের রূপরেখা হয়তো দেয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। অর্থাৎ তার আগেই সহায়ক সরকার মেনে নিতে পারে। এমনটিই দাবি করছেন, বিএনপির দায়িত্বশীল আরেক নেতা।
এদিকে দেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন ৩১ জুলাই থেকে সংলাপ শুরু করতে যাচ্ছে। প্রথম দিন সংলাপের জন্য ডাকা হয়েছে সুশীল সমাজকে। সুশীল সমাজের ৫৯ জনকে সংলাপের দাওয়াত দেয়া হয়েছে। এক দিনেই এই ৫৯ জনের মতামত নেয়া হবে। ইতিমধ্যেই পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, এতে প্রত্যেকে মাত্র ২ মিনিট করে সময় পাবেন মতামত দেয়ার জন্য।   
নির্বাচন কমিশন আগামী জাতীয় নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ অর্থাৎ কর্মপরিকল্পনাও ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছে। গত ১৬ জুলাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রোডম্যাপ প্রকাশ করেন। কিন্তু বহুল আলোচিত এই রোডম্যাপ প্রকাশকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা যেসব কথা বলেছেন তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছেন।
বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব’ এবং ‘নির্বাচন ঘোষণার আগে ইসির কিছুই করণীয় নেই’- এই দু’টি বক্তব্যে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো হতাশ হয় চরমভাবে। সেদিন থেকে বিএনপি নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নির্বাচন কমিশনের প্রতি সরাসরি অনাস্থা প্রকাশ করে তারা ঘোষণা দেয়, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সেটি আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনার রোডম্যাপ।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবশ্য এমন খোঁচা দেয়া হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন পছন্দ না হলে এই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন না কেন? কিন্তু খোঁজ নিয়ে যতটা জানা গেছে, বিএনপি নেতারা এবার আর সেই ভুল করবেন না। নির্বাচন ঘোষণার আগে অন্য কোন ইস্যুতে মাঠে নেমে শক্তি তারা ক্ষয় করবেন না। চূড়ান্তভাবে মাঠে নামার জন্য শক্তি সঞ্চয় করবেন। এবার যাতে তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে না পারে সেই প্রস্তুতিই তারা নিচ্ছেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই  প্রকাশিত)