শনিবার, ২৫-নভেম্বর ২০১৭, ০৫:৩১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের লালমাটিয়া ফ্ল্যাট প্রকল্পে লাগামহীন দুর্নীতি

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের লালমাটিয়া ফ্ল্যাট প্রকল্পে লাগামহীন দুর্নীতি

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১০ জুলাই, ২০১৭ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: ‘১৩২ ফ্ল্যাট প্রকল্প’ নামে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ রাজধানীর লালমাটিয়ায় যে প্রকল্পের বাস্তবায়ন করছে তাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট বরাদ্দ, গ্যারেজ বরাদ্দ, সরকারি অর্থ ব্যবহারসহ কোনো কিছুতেই নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, নীতিমালা অনুসরণ না করে ‘যাকে খুশি তাকে’ ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বেশক’টি ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে। এমনকি গ্যারেজ বরাদ্দেও স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জমির মূল্য নির্ধারণে প্লট গ্রহীতাদেরকে অযৌক্তিকভাবে ছাড় দেয়ার কারণে এই প্রকল্পে সরকারের বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি হতে যাচ্ছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান অনেকটা বেপরোয়াভাবেই এসব দুর্নীতি-অপকর্ম করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের মূল্য ধরা হয়েছিলো ৫,৫০০/- টাকা। অথচ প্রসপেক্টাসে চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান প্রতি বর্গফুটের মূল্য ঘোষণা করেন ৪,৫০০/- টাকা, ডিপিপি’র বাইরে যা তিনি পারেন না। পরবর্তীতে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে সংশোধিত ডিপিপি-তে মূল্য নির্ধারণ করেন বর্গফুট ৫,২০০/- টাকা।

উল্লেখ্য, শুরুতে ১৩২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প তৈরি করা হলেও এই প্রকল্পে বর্তমানে ১৫৩টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগেই অতিরিক্ত এই ২১টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১২টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়ে যায়। বাকি ৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চেয়ে ফাইল পাঠানো হয়েছিলো।

কিন্তু ইতিমধ্যে শীর্ষকাগজে এ সংক্রান্ত অনিয়মের খবর ছাপা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। ফলে এই ৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ না দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল ফেরত পাঠানো হয়। বলা হয়, নিয়মানুযায়ী গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে এ ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ দিতে হবে। সেই অনুযায়ী গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে ৭টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়। দু’টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয় বিজ্ঞপ্তির বাইরে মন্ত্রীর ইচ্ছায়, যদিও মন্ত্রীর কোটা আগেই শেষ হয়ে গেছে। তবে এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে, বিজ্ঞপ্তি জারি করা ছাড়াই ইতিমধ্যে যে ১২টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেগুলো নিয়ে। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই ১২টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান নিজের পছন্দের ব্যক্তিদেরকে এই ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ দিয়েছেন।

ফ্ল্যাট বরাদ্দের নীতিমালা হলো, একটি ফ্ল্যাট অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হলেও গণবিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা ছাড়া কোনো ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া যাবে না। কিন্তু, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান এই ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ দিয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাবার সময় বড় অংকের অর্থ তার খরচ হয়েছে। সেই অর্থ তিনি এই ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ দিয়ে উসুল করেছেন।

অন্যদিকে গ্যারেজ বরাদ্দেও বড় ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ভবনের মধ্যে গ্যারেজ আছে ৯৩টি, আর ভবনের বাইরে শেডে ৬০টি। যারা ভবনের ভেতরে গ্যারেজ পাচ্ছেন, এক্ষেত্রে প্রতিটি গ্যারেজের জন্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে ভবনের বাইরে গ্যারেজ শেডে যারা গ্যারেজ পাচ্ছেন তাদেরকে প্রতি গ্যারেজের জন্য দিতে হবে ৭ লাখ টাকার বেশি। একে এক অদ্ভূত নিয়ম বলে আখ্যায়িত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রেও চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান চরম স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী, ভবনের মধ্যে যারা গ্যারেজ পাবেন তাদেরই বেশি মূল্য ধরা উচিত। অথচ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো ও খেয়ালখুশিমতো। কিছু ফ্ল্যাট ক্রেতার সঙ্গে যোগসাজশে চেয়ারম্যান এমন উল্টো নিয়ম চালু করেছেন।

জানা গেছে, এই ‘১৩২ ফ্ল্যাট প্রকল্প’র অধীনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মোট জমি ব্যবহার হচ্ছে ৪.২০ একর। অথচ প্রকল্পের হিসাবে আনা হয়েছে ২.৬৪ একর। যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এখানে ১.৫৬ একর জমি অবৈধভাবে ছাড় দেয়া হয়েছে। সরকারি হিসেবে একর প্রতি ৮ কোটি টাকা মূল্য হিসেবে এক্ষেত্রে সরকারের ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা নীট ক্ষতি হচ্ছে। জমির বাজার মূল্য অনুযায়ী এই ক্ষতির পরিমাণ একশ’ কোটি টাকারও বেশি। কিছু ফ্ল্যাট ক্রেতার সঙ্গে যোগসাজশে সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান এই অপকর্মটি করছেন।

ফ্ল্যাট প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত জমির সঙ্গে রাস্তা, পার্ক এবং অন্যান্য খালি জায়গাসহ পুরো জমির মূল্য প্রকল্পের খরচের মধ্যে হিসাব করতে হবে। তারপরই প্লট বা ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এর কারণ, এগুলো সবই ব্যবহৃত হবে ভবনে ব্যবহারকারীদের কাজে। রাজউক, এমনকি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অন্য সবক’টি ফ্ল্যাট প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। অথচ শুধুমাত্র লালমাটিয়ার প্রকল্পে এ নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। এতে শুধুমাত্র ভবনে ব্যবহৃত জমির মূল্যকেই নির্মাণ খরচের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে সরকারের বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, ইতিপূর্বের হিসাব অনুযায়ী আরো বেশি ক্ষতির অংক দাঁড়িয়েছিলো। তখন গ্যারেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। ফ্ল্যাটের সঙ্গে গ্যারেজ ফ্রি দেয়া হচ্ছিলো। শীর্ষকাগজে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে তোলপাড় হয়। মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উপরের মহল থেকে চেয়ারম্যানের উপর চাপ পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দুদকের মামলার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে গ্যারেজের মূল্য নির্ধারণ করে ক্ষতির পরিমাণ কমানো হয়। কিন্তু, এখন গ্যারেজ বরাদ্দ নিয়েও ব্যাপক বৈষম্য দেখা দেয়ায় সম্পূর্ণ প্রকল্পটি প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে সরকারের নিয়ম অনুযায়ীই রাস্তাসহ মোট জমি হিসাবে আনা হয়েছিলো। মোট জমির মূল্য হিসাবে এনে ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাহি প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় এবং মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু, পরে সেই হিসাবকে বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শুধু ভবনের কাঠামোর জমি হিসাবে আনেন। এতে জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ২.৬৪ বিঘা। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এ দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন।