শুক্রবার, ২৮-জুলাই ২০১৭, ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন
| প্রকাশ : ১০ জুলাই, ২০১৭ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

প্রশাসনে কর্মদক্ষতা ও কর্মস্পৃহায় ধ্বস নামছে

একরামুল হক: আমার ঘনিষ্ঠ সচিব পদের সাবেক একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে জনপ্রশাসনের বর্তমান দলাদলি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আলাপ হচ্ছিলো। এই কর্মকর্তা ওয়ান ইলেভেনের আমলে সচিব পদে ছিলেন, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ আমলেও বেশ কিছুদিন সচিব পদে কাজ করেছেন। একেবারে চাকরির শেষ দিন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো মন্ত্রণালয়েরই সচিব পদে ছিলেন। কথায় কথায় আমাকে তিনি বললেন, “দেখুন ৭/৮ বছর আগের কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তখনকার একটা কমেন্ট এখনো আমার কানে বাজছে। একদিনের ঘটনা। মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবালয়ের দফতরে অফিস করছিলেন। আমি যে মন্ত্রণালয়ের সচিব এখানকার কোন এক জরুরি কাজে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে আমার ডাক পড়লো। ভেতরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমামসহ সিনিয়র ব্যক্তিরা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে পদায়ন নিয়ে কথা বলছিলেন। বলা যায়, একেবারেই ‘একান্ত’ আলোচনা চলছিলো। এসময় আমি কয়েক মিনিটের জন্য সেখানে ছিলাম। উপস্থিত অন্যরা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, ওমুক বিএনপি-জামায়াতের, ওমুক ‘আমাদের’- ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী এমন বিভাজনে অত্যন্ত বিরক্ত হচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের আর তাদের- আমি এসব শুনতে চাই না। কে দক্ষ-যোগ্য, কে অদক্ষ এভাবে বিভাজন করুন। শুধু আমাদের লোক হলেই চলবে না। কাজ জানতে হবে। অযোগ্য ব্যক্তিকে বসিয়ে দিলে সরকারের ক্ষতি হবে। সরকার চলবে না তাতে সবারই ক্ষতি।’ এসময় উপস্থিত অন্য সবাই কিছুটা থমকে গেলেন। এইচটি ইমাম সাহেব কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, আমার দিকে খেয়াল করে থেমে গেলেন। বুঝলাম, আমি অবাঞ্চিত। এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। আমাকে যে প্রসঙ্গে ডাকা হয়েছিলো দ্রুত তা সেরে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়লাম।”

ওয়ান ইলেভেন আমলের সচিব হলেও এই কর্মকর্তা মূলত বিএনপি ঘরানার লোক বলেই পরিচিত ছিলেন। বিএনপি আমলে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর পিএস হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ইনি আমাকে বললেন, “দেখুন ভাই, নীতিনির্ধারকদের ভেতরের ওই আলোচনার সামান্য কিছুটা যা প্রত্যক্ষ করলাম তাতে মনে হলো, প্রধানমন্ত্রীর চিন্তা-চেতনা অনেক ক্ষেত্রে বেশ ভালোই ছিলো। কিন্তু, চামচাদের অতি বাড়াবাড়ির কারণে তার সেই ‘ভালো’ চিন্তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এই চামচারাই গোটা সরকারকে দলাদলির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে। দলাদলি ক্রমশই এতো চরম আকার ধারণ করেছে যে, দক্ষতা-যোগ্যতা এখন আর বিবেচনায়ই আনা হয় না। এতে সুবিধাবাদী শ্রেণীটির ব্যাপক লাভ হয়েছে। তারা সরকারের উপর প্রভাব খাটিয়ে দফায় দফায় নানান ধরনের সুবিধা আদায় করে নিয়েছে এবং নিচ্ছে। অন্যদিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে নিরীহ, যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তারা। যে কারণে আজ সর্বত্র এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে।” তার বক্তব্য অনুযায়ী, জনপ্রশাসনে আজ মোটামুটিভাবে দু’ধরনের লোকই বেশি দেখা যাচ্ছে। কেউ চরমভাবে বঞ্চিত, আবার কেউ অতি সুবিধাভোগী। দু’টো শ্রেণীই কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মদক্ষতা যদিও ছিলো, কর্মস্পৃহা না থাকার কারণে সেই দক্ষতাও লোপ পেতে বসেছে।

পদোন্নতি বঞ্চিত একজন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলছিলেন, দেখুন ভাই, অফিসের কাজকর্মের প্রতি মনোযোগই দিতে পারছিনা। কাজ করবো কখন, পদোন্নতির চিন্তা করতে করতেই দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সারাক্ষণ টেনশনে থাকতে হচ্ছে। কাকে ধরলে পদোন্নতি পাবো, এই চিন্তাই মাথায় সর্বক্ষণ কাজ করছে। প্রত্যেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। বাসায় গেলে স্ত্রী ‘গ্যান গ্যান’ করে। প্রতিবারই পদোন্নতি থেকে বাদ পড়ার পর ভাবি, পরবর্তী দফায় কোমর বেঁধে নামতে হবে। বাসায় স্ত্রীর এক কথা, ‘তুমি ঠিকমতো তদবির করছো না।’ ‘আসলে তুমি কোনো কাজেরই না।’ বাস্তবে কথাটা ঠিক। চাকরির এতো বছর হয়ে গেলো, তদবির কাকে বলে কখনো বুঝিনি। প্রয়োজনও হয়নি। চাকরি ক্ষেত্রে ভালো কাজ ও দক্ষতার জন্য বাহবা পেয়ে এসেছি। এতে কাজে আরো উৎসাহিত হয়েছি, কাজ করেছি। সরকার এবং জনগণকে সেবা দিতে পেরেছি। কিন্তু, পদোন্নতি নিয়ে এমন বিপাকে পড়তে হবে কখনো ভাবিনি। ভাববার কথাও নয়। যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি হবে এটাই তো নিয়ম ছিলো। এই নিয়মেই তো চলছিলো প্রশাসন।

এই কর্মকর্তা আফসোস করে বললেন, দেখুন ভাই, জীবনে একটা বড় ভুল করে ফেলেছি। এক দালাল এসে ১০ লাখ টাকা চেয়েছিলো। নিজের কাছে এতো নগদ টাকা নেই। কিন্তু, বাপ-দাদার সম্পত্তি তো আছে। তাছাড়া বড়লোক শ্যালকের কাছ থেকে নিয়েও দালালকে দিতে পারতাম। দেইনি। ভেবেছি, আমি তো দুর্নীতি করি না, কাজেকর্মেও অদক্ষ-অযোগ্য না, ঘুষ কেন দেবো। তাছাড়া আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, প্রশাসনে পদোন্নতিতে এমন ঘুষ লেনদেন চলবে, আমাদের সিনিয়র স্যাররা পদোন্নতিতে এভাবে ঘুষ খাবেন? সেই যে ভুল করলাম, আর পদোন্নতি হলো না। দালালও আর ধরা দিলো না। প্রথমবার বাদ পড়ার পর সেই দালালের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছিলাম। তার এক কথা, ‘সুযোগ সব সময় আসে না। মাত্র ১০ লাখ টাকার জন্য নিজের জীবনটাকে নষ্ট করলেন?’ আরো বললো, ‘এখন এই অফার আপনার জন্য না। অনেক ক্যান্ডিডেট আছে। আপনার পদোন্নতি আর হবে না।’

কী করবো, ভেবে কূল পাচ্ছি না। সারাক্ষণ টেনশনে থাকি। মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরও বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে নানা রকমের রোগও পেয়ে বসেছে। এক দফায় স্ট্রোকও করেছি। আমার পরিচিত এরকমের কয়েকজন ইতিমধ্যে পদোন্নতির টেনশন করতে করতে স্ট্রোকে মারাও গেছেন।

এই কর্মকর্তার মতে, প্রশাসনের কমবেশি প্রায় সব কর্মকর্তাই এখন চরম টেনশন আর অস্থিরতায় ভূগছে। তবে পদোন্নতি বঞ্চিতদের টেনশন এক রকমের, আবার পদোন্নতি প্রাপ্তদের টেনশন অন্য ধরনের। তিনি বলেন, ‘আমার নিজেরও এখন কর্মস্পৃহা-কর্মদক্ষতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বঞ্চিত কর্মকর্তা সবারই যে আমার মতো বিপর্যস্ত অবস্থা, এটা ব্যাখ্যা করে বলার নিশ্চয় দরকার নেই। কাজ করলেই তো দক্ষতা বাড়বে। কিন্তু, কাজে কোনো মন দিতে পারছি না। এমনকি অতীতে যা দক্ষতা অর্জন করেছি সেটাও লোপ পেতে যাচ্ছে।  

এদিকে প্রশাসনে এখন এক শ্রেণীর কর্মকর্তার মধ্যে পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের নেশা চেপে বসেছে। এক দফা পদোন্নতি পাবার পর এরা আরেক দফায় পদোন্নতির জন্য দিন গুণতে থাকে। এছাড়া পোস্টিংসহ রাতারাতি অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার প্রবণতা পেয়ে বসেছে এই শ্রেণীর কর্মকর্তাদের মধ্যে। যে কারণে অফিসের কাজকর্মের প্রতি এদের অনীহার ভাবই বেশি লক্ষ করা যায়। এতে তারা নতুন দক্ষতা তো অর্জন করছেনই না, বরং যেটুকু দক্ষতা ছিল তাও কাজে না লাগানোতে হারিয়ে যেতে বসেছে। সকল মেধা ও শ্রম শুধু আখের গোছানোর কাজেই ব্যয় করছে। সেবাদান বা সরকারের কাজকে গতিশীল ও উন্নয়নমূলক চিন্তা এদের মধ্যে নেই বললেই চলে। অথচ তারা সরকারের কল্যাণের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা বের করে দেন। বাস্তবে সরকারের কল্যাণ তো নয়ই, নিজের কল্যাণে সরকারের ক্ষমতাকে অপব্যবহার, অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাটেই বেশি সময় নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন। এই শ্রেণীর কর্মকর্তাদের অধিকাংশেরই বিদেশে সেকেন্ড হোম রয়েছে। ছেলে-মেয়ে, কেউ কেউ স্ত্রীসহ সবাইকেই বিদেশে রাখছেন। আবার কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনকেও বিদেশে সেটেলড করছেন নিজের পাচার করা সম্পদ দেখাশোনার জন্য। এতে সরকারের বারোটা বাজতে চলেছে। সরকারি কাজকর্মেও গতি অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়েছে। সর্বত্র দেখা দিচ্ছে, বিশৃঙ্খলা। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ প্রত্যেকটি খাতের দিকে তাকলেই বোঝা যাবে কতটা খারাপভাবে চলছে কাজকর্ম। শুধুমাত্র সরকারের বৃহৎ আকারের দু’একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প ছাড়া অধিকাংশ প্রকল্পেরই বেহাল অবস্থা হয়ে পড়েছে।

সরকারের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উদ্দেশ্যে বা যে চিন্তা-চেতনা থেকে কথাগুলো বলেছিলেন সেটি অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি, বলছিলেন সাবেক এই সচিব। তার মতে, প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পথে নেয়া হয়েছে। আর এ কারণেই প্রশাসনসহ সর্বত্র লেজে-গোবরে অবস্থা দেখা দিয়েছে।