শনিবার, ২৫-নভেম্বর ২০১৭, ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন
আল্টিমেটামের মেয়াদ শেষ

হার্ডলাইনের পরিবর্তে সমঝোতার পথে সরকার

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট, ২০১৭ ০৯:২৭ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের দাবিতে দেয়া আল্টিমেটামের মেয়াদ গতকাল শেষ হয়েছে। রায়ে দেয়া পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনড় অবস্থানেই রয়েছেন প্রধান বিচারপতি। আলোচিত এই রায়কে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে মুখোমুখী অবস্থানের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সব মহলেই।
তবে সর্বশেষ জানা গেছে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন- হার্ডলাইনে গিয়ে লাভ নেই। তাতে বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা বা পদ থেকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। জোর করে সরিয়ে দিতে গেলে তা থেকে মহাবিপদ দেখা দিতে পারে। তাই এখন আর এস কে সিনহার পদত্যাগ নয়, উল্টো কোন এক ধরনের সমঝোতার পথেই রয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। ভেতরে ভেতরে এই সমঝোতার প্রক্রিয়া কিছুটা এগিয়েছেও।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে প্রধান বিচারপতি মাঝে কিছু সময়ের জন্য ছুটিতে যেতে পারেন। বিনিময়ে সরকার তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারবে না, এ ধরনের কোন প্রক্রিয়াও চালাতে পারবে না। এছাড়া আরো কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে সরকারকে।
অবশ্য সরকারি দল আওয়ামী লীগ বা সরকারের মূল যে দাবি- রায় বাতিল বা রায়ের পর্যবেক্ষণ এক্সপাঞ্জ করা, এ থেকে তারা মোটেই সরে আসছে না বলে জানিয়েছেন একজন শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। কারণ, এই রায় সরকারের মূল ভিতে আঘাত করেছে। ওই নেতার মতে, রায়ের পর্যবেক্ষণগুলো সরকারের ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এদিকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও রায় বাতিল বা পর্যবেক্ষণ এক্সপাঞ্জ করার দাবি মানতে রাজি নন বলে জানা গেছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, রিভিউ আবেদন করা হলে বিবেচনা করে দেখবেন। তবে তাতে আওয়ামী লীগ সরকার আশ্বস্ত হতে পারছে না। প্রধান বিচারপতির সকল কর্মকাণ্ডকেই তারা এ মুহূর্তে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তারপরও হাডলাইনের পরিবর্তে সমঝোতার পথেই এগুতে হচ্ছে সরকারকে।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বলা যায়, এক রকমের মুখোমুখি যুদ্ধই চলে আসছে সরকার ও দেশের বিচার বিভাগের মধ্যে। গত ১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে দেয়া পর্যবেক্ষণে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সংসদকে অকার্যকর ও অপরিপক্ক বলার পর তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। টানা এক সপ্তাহ নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর ৭ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার আলোচনায় এই রায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই রায়ের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ আসতে শুরু করে। সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা বিচার বিভাগ ও প্রধান প্রধান বিচারপতিকে তুলোধুনো করেন। পাশাপাশি ভেতরে ভেতরে সরকারের পক্ষ থেকে সমঝোতারও চেষ্টা চালানো হয়। প্রধান বিচারপতিকে বক্তব্যের কিছু অংশ এক্সপাঞ্জ করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত ফল না আসায় শেষ পর্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয় সরকার। এক্ষেত্রে সরকার দু’টি পথে এগোয়। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের পক্ষ থেকে রায়ে উল্লেখিত (সরকারের) অপছন্দের শব্দগুলো সুয়োমোটো এক্সপাঞ্জসহ (স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহার) পুরো রায়টি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি দেয়া হয়। অন্যদিকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে চাকরিচ্যুত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। এমনকি অসুস্থ আখ্যায়িত করে তার পরিবর্তে অন্যকে দায়িত্ব দেয়ার কথাও সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আনা হয়।
গত ২০ আগস্ট রোববার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের উদ্যোগে সরকার সমর্থিত আইনজীবীদের একটি সমাবেশ হয়। সমাবেশে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে দেয়া কিছু বক্তব্যকে  ‘অপ্রাসঙ্গিক ও অসাংবিধানিক’ উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি করা হয়। সমাবেশে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্যসচিব ফজলে নূর তাপস বলেন, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায়ে ‘অপ্রাসঙ্গিক যে বক্তব্যগুলো রাখা হয়েছে,’ সেগুলো সুয়োমোটো এক্সপাঞ্জসহ (স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহার) পুরো রায়টি বাতিলের দাবি করছি। তিনি বলেন, ২৪ আগস্ট কোর্ট বন্ধ হয়ে যাবে। এর মধ্যে দাবি না মানলে ছুটির পর দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি নেয়া হবে। সে ক্ষেত্রে দাবি একদফায় পরিণত হতে পারে।
পরে সংগঠনটি ২২ আগস্ট মঙ্গলবার সুপ্রিমকোর্ট বারের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করে। ওই সমাবেশ থেকে প্রধান বিচাপতিকে পদত্যাগে আল্টিমেটাম দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ২৪ আগস্টের মধ্যে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে দেয়া পর্যবেক্ষণ ও রায় প্রত্যাহার করে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগের আহ্বান জানায় বক্তারা।  তা না হলে এক দফা আন্দোলনে যাবার হুঁশিয়ারি দেন বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের নেতারা। এসময় ২৪ আগস্টের মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রত্যাহার করে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়।
একইদিন (২২ আগস্ট মঙ্গলবার) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের উত্তর হলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম এক প্রতিবাদ সমাবেশ করে। ওই সমাবেশ থেকে ‘প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের দাবি’ তোলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। এ সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। বিচার বিভাগ নিয়ে মন্তব্য করার কারণে আপনি নিজেই পদত্যাগ করুন।’ জয়নুল আবেদীন আরো বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি একা এই রায় দেননি। আপিল বিভাগের সকল বিচারপতি একমত হয়ে এই রায় দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতিকে বলব, সরকারের কিছু ব্যক্তি ছাড়া ১৬ কোটি মানুষ আপনার সঙ্গে আছে।’
শীর্ষনিউজ/এসএসআই