শুক্রবার, ২০-অক্টোবর ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিচালকের দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার পরও ধামাচাপা

স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিচালকের দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার পরও ধামাচাপা

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর, ২০১৭ ০১:০৬ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে:স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. আব্দুর রশিদ চিকিৎসা শিক্ষা খাতে যে ব্যাপক দুর্নীতি করে চলেছেন তারমধ্যে একটি ঘটনায় তিনি হাতেনাতে ধরাও পড়েছেন। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে তার দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও ডা. রশিদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। বরং সেই দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নেপালী শিক্ষার্থী আনসু সুতিহার (Anshu Sutihar) গত ২১ জানুয়ারি, ২০১৬ সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বরাবর একটি ই-মেইল করেন। তিনি ই-মেইলে উল্লেখ করেন যে, ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। অপরদিকে নেপালী শিক্ষার্থী রেবিক্কা প্রধান (Rebicca Pradhan) কে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। নেপালী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনসু সুতিহার-এর মেধাক্রম ছিলো প্রথম। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
নেপালী ছাত্র আনসু সুতিহারের এ লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তখনকার স্বাস্থ্যসচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ওইদিনই এটি তদন্তের দায়িত্ব দেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব রাশিদা বেগমকে। তদন্ত কর্মকর্তা রাশিদা বেগম দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুর রশিদকে লিখিত বক্তব্য ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্রসহ উপস্থিত হওয়ার জন্য নোটিশ জারি করেন। এক্ষেত্রে রাশিদা বেগম তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য মোট ৪টি বিবেচ্য বিষয় নির্ধারণ করেন। (১) ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় নেপালী শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে কি নির্দেশনা ছিলো? (২) সার্ক কোটায় নেপালী শিক্ষার্থী আনসু সুতিহার মেধাক্রমে প্রথম ছিলো কিনা? (৩) সার্ক কোটায় সংশ্লিষ্ট নেপালী শিক্ষার্থী মেধাক্রম অনুযায়ী কোন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য যোগ্য ছিলো? (৪) অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি নির্ধারণ।
তদন্তকারী কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব রাশিদা বেগম নোটিশ জারির প্রায় এক মাস পর ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) ডা. মো. আব্দুর রশিদ হাজির হয়ে লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে ডা. রশিদ এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান, ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত নেপালী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১৯ (উনিশ) জন। তন্মধ্যে নিপালী শিক্ষার্থী আনসু সুতিহার  মেধাক্রমে প্রথম ছিলো এবং রেবিক্কা প্রধান এর মেধাক্রম ত্রয়োদশ (১৩) ছিলো। উক্ত ছাত্র-ছাত্রীদের আবেদনপত্রে পছন্দনীয় কলেজ একই ছিলো। প্রথমত ঢাকা মেডিকেল কলেজ, দ্বিতীয়ত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, তৃতীয়ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ।
তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে
তদন্ত কর্মকর্তা, যুগ্মসচিব রাশিদা বেগমের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত সচিব, স্বাপকম এর সভাপতিত্বে ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক ও নন সার্ক কোটায় সরকারি মেডিকেল/ ডেন্টাল কলেজে এমবিবিএস/ বিডিএস কোর্সে বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি সংক্রান্ত ০৮.১২.২০১৫ তারিখে সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায় যে, ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে নেপালের ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট থেকে ২৩১টি আবেদন পাওয়া যায়। সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে নেপালী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত আসন সংখ্যা ১৯ (ঊনিশ)টি। পরিচালক (চিকিৎশা শিক্ষা) তদন্তকালে জানায় যে, বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির জন্য সরকারি নীতিমালা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত আবেদনপত্র এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক মার্কস সমতাকরণ বিষয়সমুহ বিবেচনা করে ছাত্র-ছাত্রী কোন কলেজের জন্য উপযুক্ত তা নির্ধারণ করা হয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি সংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এমবিবিএস কোর্সে নেপালের জন্য সংরক্ষিত ১৯ (ঊনিশ)টি আসনের বিপরীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২৩১টি আবেদনপত্র পাওয়া যায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “উক্ত ছক থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আনসু সুতিহার প্রথম স্থান অধিকারী। অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও চিকিৎসা শিক্ষা) এর সভাপতিত্বে ১৩/১২/২০১৫ তারিখে আলোচনা যাচাই/ বাছাই এবং আসন বন্টন সংক্রান্ত দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে চলতি শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জন্য মেধাক্রম অনুযায়ী প্রথম স্থান এবং আগ্রহী প্রার্থী ৫ জনকে নির্বাচন করা হয়। তন্মধ্যে ভারত-০১ জন, নেপাল- ০১ জন, শ্রীলংকা- ০১ জন এবং ভূটানের ০২ জনকে নির্ধারণ করা হয়। কাজেই সভার সিদ্ধান্ত এবং মেধাক্রম অনুযায়ী আনসু সুতিহার ঢাকা মেডিকেল কলেজের জন্য উপযুক্ত এবং ভর্তি হওয়ার জন্য যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অধ্যাপক ডা. আব্দুর রশিদ (চিকিৎসা শিক্ষা) রেবিক্কা প্রধান (১৩তম) কে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য আদেশ জারি করেন। যা সার্ক কোটার এমবিবিএস কোর্সে বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি সংক্রান্ত নীতিমালা এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপন্থি। এক্ষেত্রে মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো অনুমোদন উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। তিনি (পরিচালক, চিকিৎসা শিক্ষা) জানান যে, বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি সংক্রান্ত কোনো নথি নেই। অথচ সচিবালয় নির্দেশমালা ২০১৪ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই নথি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।”
দেখা যাচ্ছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা, যুগ্মসচিব রাশিদা বেগমের তদন্তে পরিচালক ডা. রশিদের অনিয়ম-দুর্নীতি হাতেনাতে প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে এ অনিয়ম-দুর্নীতির দায়-দায়িত্ব নিরূপণ প্রসঙ্গে বলা হয়, “নেপালী শিক্ষার্থী Anshu Sutihar মেধাক্রম অনুযায়ী ১ম স্থান অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও এই শিক্ষাবর্ষে MBBS কোর্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরিবর্তে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির  আদেশ জারি করা হয়। অধ্যাপক ডা. আব্দুর রশিদ পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক এ আদেশ জারি করা হয়। তিনি উক্ত আদেশ জারির জন্য ভুল স্বীকার করেন। ভুল স্বীকার করায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি এ আদেশ জারি করার জন্য দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রভাবশালী পরিচালক ডা. রশিদ প্রভাব খাটিয়ে মাঝে এই তদন্তের কাজ থামিয়ে দিতে সক্ষম হন। অবশেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা, যুগ্মসচিব রাশিদা বেগম এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন ১৩ জুলাই, ২০১৬। কিন্তু, তদন্ত প্রতিবেদনে পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) ডা. রশিদের দুর্নীতি হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ার পরও ইতিমধ্যে ৭ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। স্বাস্থ্যখাতে এটা প্রচারিত আছে যে, ডা. রশিদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রিয়ভাজন। আর এ কারণেই ডা. রশিদ এভাবে একের পর এক দুর্নীতি-অপকর্ম করে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ৬ মার্চ প্রকাশিত)