বুধবার, ১৩-ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:০৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বিসিআইসিতে অবৈধ সিবিএ’র নৈরাজ্য নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি

বিসিআইসিতে অবৈধ সিবিএ’র নৈরাজ্য নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর, ২০১৭ ০১:১৯ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-তে সিবিএ পদে যারা আছেন এদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি। মেয়াদ শেষের আগে নির্বাচনের তারিখও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু, নতুন নির্বাচনের অর্থাৎ ভোটাভুটির ব্যবস্থা না করে বিএনপি সমর্থক কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ ও কূটকৌশলের মাধ্যমে আগের কমিটিই অবৈধভাবে পদ দখল করে রেখেছে। এমনকি ‘বিসিআইসি কর্মচারী লীগ’ নামে যে সংগঠনের ব্যানারে এরা সিবিএ নেতা হয়েছিলেন সেই সংগঠনেরও নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। কর্মচারী লীগের নেতৃত্বও এরা জোর করে দখল করে রেখেছেন। অন্যদিকে, ভুয়া এই সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের চাকরি শেষ হয়ে গেছে পৌনে দু’বছর আগে। অথচ অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মচারী এখনো সিবিএ পদ দখল করে আছেন।
বিসিআইসি’র নিয়োগ-বদলি, বাসা বরাদ্দসহ প্রত্যেকটি কাজে এই অবৈধ নেতারা হস্তক্ষেপ করছেন। শুধু তাই নয়, সারের ডিলারশিপ, সার পরিবহন, আমদানি-রফতানিতেও এদের অবৈধ দাপট। এদের দাপটে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও অনেক ক্ষেত্রে অসহায়। ঘুষ নিয়ে চাকরিতে নিয়োগ, আবার চাঁদা না দেয়ায় চাকরি থেকে বরখাস্তসহ ব্যাপকহারে স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাচ্ছে তথাকথিত সিবিএ নামধারী এই দুর্নীতিবাজ নেতারা। এদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার সাহস কারো নেই। বিগত সময়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জিম্মি করে এরা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়েছে। এদের অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারো নেই। দু’একজন যারাই কথা বলার চেষ্টা করেছেন তাদেরকে চাকরিচ্যুতি, হয়রানিমূলক বদলিসহ চরম নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও রেহাই পাচ্ছেন না। অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও এদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। অনেকে শাস্তিমূলক বদলি, এমনকি চাকরিচ্যুতও হয়েছেন। এদের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাকরি হারিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মো. মিরাজ। আরো মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা হয়রানিমূলক বদলিসহ নানা রকমের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি কট্টর আওয়ামী লীগ আদর্শে বিশ্বাসী সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এদের নিপীড়ন-নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাননি। সিবিএ নামধারী কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মচারী এই প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। এদের দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে সরকারের সবচেয়ে বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠানটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।
কর্মচারী লীগ সংগঠনের নেতৃত্বও অবৈধ
বিসিআইসি’র সিবিএ’র নেতৃত্ব যারা জোর করে দখল করে রেখেছেন শেখ নুরুল হাদী- দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী-সাইদুর রহমান গং- এদের মূল সংগঠন ‘বিসিআইসি কর্মচারী লীগ’এর কার্যনির্বাহি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। কার্যনির্বাহি কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ১০ জুলাই, ২০১৬ নতুন নির্বাচনের জন্য কর্মচারীদের পক্ষ থেকে শ্রম অধিদফতরে চিঠি দেয়া হয়। শ্রম অধিদফতর বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ৩১৭ (৪) (ঘ) দ্বারা ও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং ৭৩৭২/২০১১ এবং ৪৩১৬/২০১৪ এর ৮/৭/২০১৪ ইং তারিখের নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রম পরিচালকের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫ এর ১৬৯ (১) বিধি অনুযায়ী ইউনিয়নের সাধারণ সদস্যদের সংখ্যা অনুপাতে কার্যকরী কমিটির কলেবর নির্ধারণ পূর্বক স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ২৩ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক যথাযথ সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য ১/৮/২০১৬ তারিখে পত্র জারি করে। কিন্তু, শ্রম অধিদফতরের চিঠির পর এই দুর্নীতিবাজ নেতারা কর্মচারী সংগঠনের নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিল নির্বাচন হলে তাদের জয়লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। এদিকে মূল কর্মচারী সংগঠনের নেতা যদি হতে না পারে তাহলে সিবিএ নেতৃত্বে  থাকাও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। দুর্নীতি-লুটপাটের এতো সুযোগ- সবই হাতছাড়া হয়ে যাবে।  
হাইব্রিড আওয়ামী লীগের আবির্ভাব
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)তে দু’টি কর্মচারী সংগঠন রয়েছে। একটি বিসিআইসি কর্মচারী লীগ (রেজি. নং বি-২০০১) ও অপরটি বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী কর্মচারী দল (রেজি. নং ঢাক-১৫৬৫)। উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াতের আমলে ২০০৩-২০০৫ সালে বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী কর্মচারী দল (রেজি. নং ঢাক-১৫৬৫) সিবিএ’র কর্তৃত্বে ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর ক্রমান্বয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের সুবিধাবাদী নেতারা লেবাস পরিবর্তন করে ঢুকতে থাকে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এসব হাইব্রিড নেতার আগমন ঘটে ব্যাপকহারে। এরই ধারাবাহিকতায় বিসিআইসিতেও বিএনপি-জামায়াতের সুবিধাবাদী নেতারা লেবাস পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ সমর্থক সংগঠন ‘বিসিআইসি কর্মচারী লীগ’-এ ঢুকে পড়ে। এমনকি এরা এক পর্যায়ে কমিটিরও গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নেয়। কতিপয় সুবিধাবাদী আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মচারী নেতার সঙ্গে যোগসাজশ করে এরাই এখন গোটা বিসিআইসিতে নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মো. মিরাজ যেভাবে রোষানলের শিকার
বীর মুক্তিযোদ্ধা এ. হামিদ (মঞ্জু) এর সন্তান মো. মিরাজ বিসিআইসিতে চাকরি পেয়েছিলেন ২০১০ সালে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবেই সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ০৫/১১/২০১০ ইং তারিখে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এমএলএসএস পদে নিয়োগলাভ করেন মো. মিরাজ। কিন্তু তাকে নিয়োগের সময় তখনকার সিবিএ’র যুগ্ম সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান এবং কার্যকরী সভাপতি দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী চাকরি দেয়ার কথা বলে প্রতারণা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মিরাজ হোসেনের বাবা মুক্তিযোদ্ধা এ. হামিদের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে জানা যায়, মো. মিরাজের চাকরি হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। বিসিআইসি কর্তৃপক্ষও তা স্বীকার করেন।
গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তায় মো. মিরাজের বাবা-মা ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের উপর চড়াও হন সাইদুর-দেলোয়ার। এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কোনো কারণ ছাড়াই মো. মিরাজকে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা করা হয়। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উপর চাপ প্রয়োগ করে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। শুধু চাকরিচ্যুতিই নয়, তাকে বিসিআইসির সরকারি বাসা থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চালানো হয়। যিনি জাতিকে একটি স্বাধীন পতাকা দিয়েছেন তার একমাত্র সন্তানকে চাকরিচ্যুত করা হলো।
শুধু মিরাজই নয়, আরো অত্যাচার নির্যাতন
মো. মিরাজ ছাড়াও বিসিআইসির নির্মাণ বিভাগের এমএলএসএস মো. আলমগীর এবং সিকিউরিটি গার্ড মো. রুমনকেও চাকরিচ্যুত করা হয়। একসময়ের বিএনপি-জামায়াত সমর্থক লেবাস পরিবর্তনকারী এই হাইব্রিড নেতাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এসব কর্মচারী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এছাড়া আরো অনেককে হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে। সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক, সাবেক কার্যকরী সভাপতি মো. তারিকুল ইসলাম, সাবেক যুগ্মসম্পাদক আ. ছালাম ও মো. জসিম উদ্দিন, মো. আলমগীর চৌধুরী, মো. হানিফ মিয়া, মো. রাজু সরকার, আশফাকুল হক সিদ্দিকীসহ আরো অনেককেই হয়রানিমূলকভাবে বদলি করা হয়েছে। এদের সবাই কট্টর আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মচারী নেতা। দুর্নীতিবাজ-অবৈধ সিবিএ নেতারা তাদের ক্ষমতার দাপট ও দুর্নীতি-লুটপাটের রাজত্ব পাকাপোক্ত করার জন্য এই নিরীহ কর্মচারী এবং কর্মচারী নেতাদের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়েছেন। আওয়ামী লীগের অনেক জাতীয় নেতৃবৃন্দ বিসিআইসির এসব কর্মচারী-কর্মকর্তার হয়রানিমূলক বদলি ও চাকরিচ্যুতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারপরও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এমনকি অনেকে রিট মামলা দায়ের করে উচ্চ আদালত থেকে আদেশ আনার পরও চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না অবৈধ সিবিএ নেতাদের বাধার কারণে।  
জানা গেছে, দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীসহ সিবিএ নেতাদের দাবিকৃত চাঁদার অর্থ না দেয়ায় এমটিএস বিভাগের সহকারী জেনারেটর অপারেটর মো. আব্দুস সালাম, গাড়ি চালক মো. আশফাকুল হক সিদ্দিকী, ডুপ্লিকেটিং মেশিন অপারেটর মো. নুরুল আমিনকে হয়রানিমূলক বদলি করা হয়। কথিত নেতারা বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান ও বার্ষিক পূণর্মিলনী অনুষ্ঠানের কথা বলে এই কর্মচারীদের কাছে ৫০/৬০ হাজার টাকা করে চেয়েছিলেন। টাকা না দেয়ায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উপর প্রভাব খাটিয়ে এদেরকে হয়রানিমূলক বদলি করা হয়।   
জন্মগত পঙ্গু-প্রতিবন্ধীকে নানাভাবে হয়রানি ও হয়রানিমূলক বদলি
বিসিআইসির সিনিয়র ক্লার্ক অপূর্ব কীর্ত্তনীয়াকে কয়েক দফায় হয়রানিমূলক বদলি, জিডি ও শোকজের পর বিসিআইসি চিকিৎসা কেন্দ্রে পদায়ন করা হয়েছে। তিনি অসহায় বিধবা বৃদ্ধা মা-কে নিয়ে একটি পরিত্যক্ত বাসায় বসবাস করেন। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী আবাসিক ভবনে বাসা বরাদ্দ দেয়ার জন্য সার্কুলার দেয়া হয়। উক্ত সার্কুলারের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য কর্মচারীদের ন্যায় আবেদন করার পর উৎকোচ থেকে রেহাই পাননি তিনি। একটি বাসার জন্য এই অসহায় পরিবারটিকেও শেষ সম্বল ভিটে-মাটি বন্ধক রেখে ৬০ হাজার টাকা যোগাড় করে এনে তথাকথিত এই সিবিএ নেতাদের হাতে দিতে হয়েছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের  ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত)